‘বৈষম্য রোধে জীবন দিয়েও বৈষম্যের শিকার আমার ছেলে’
Printed Edition
চট্টগ্রাম ব্যুরো
ছেলে যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জীবন দিলো, সেই এখন বৈষম্যের শিকার। চট্টগ্রামে শহীদদের নিয়ে অনুষ্ঠান হলে ব্যানারে থাকে শুধু ওয়াসিমের নাম। আমার ছেলে শান্ত ও ওমর ফারুকের নাম উপেক্ষিত। গতকাল শান্তর মা কোহিনুর আক্তার ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে নয়া দিগন্তকে এ অভিযোগ করেন।
গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসনের আলোচনা সভায়ও তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। কোহিনুর আক্তার বলেন, যে স্থানে ওয়াসিম আকরাম নিহত হয়েছে, সেখানে তাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে। তাহলে আমার শান্তমনি ও ওমর ফারুক নিহতের স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ হবে না কেন? এটি তো বৈষম্য।
সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে খোঁজ নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে খোঁজ রাখা হতো। এখন সেভাবে হয় না। শহীদ পরিবারের কোনো অনুষ্ঠান থাকলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা মেসেজ দিয়েই দায় সারেন তারা। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা খোঁজ রাখলেও যোগাযোগ রাখেন না ক্ষমতাসীন দলের কেউ। অথচ সরকারি দল হিসেবে তাদের দায়িত্ব বেশি বলেই মন্তব্য করেন শহীদ জননী কোহিনুর আক্তার।
চব্বিশের জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, এক পুলিশ কর্মকর্তা বারবার আমাকে জেরা করলেও ছেলের কাছে যেতে দিচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে আমাকে পাঁচলাইশ থানায় নিয়ে বিভিন্ন কাগজে সই করতে বলেন। তখন বুঝলাম, এটি ময়নাতদন্তের অনুমতিপত্র। আমার ছেলের পায়ে নয়, গুলি লেগেছে বুকে- এটি জানার পর আমি জ্ঞান হারাই।
১৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রাণ হারান তিনজন। শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত, শহীদ ওয়াসিম আকরাম ও শহীদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
নয়া দিগন্তকে শহীদ শান্তর মা জানান, ঘটনার দিন বিকেলে শান্ত টিউশনি শেষ করে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। সেই যে গেল আর ফিরে এলো না আমার বুকের ধন। একমাত্র ছেলেকে ছাড়া দুটো বছর কেমন কেটেছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’
শান্তর পরিবার থাকে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায়। বাসার ড্রয়িং রুমে টেবিলে সাজানো বই, ছবির অ্যালবাম আর দেয়ালে ঝোলানো ক্যালিগ্রাফি, সব কিছুতেই মিশে আছে শান্তর স্মৃতি।
ছেলের ব্যবহৃত জিনিস আগলে রেখে স্মৃতি রোমন্থন করেই দিন কাটে মায়ের। চট্টগ্রামের এমইএস কলেজের বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। চব্বিশের ১৬ জুলাই নগরীর মুরাদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে লক্ষ্যে আমাদের ছেলেরা জীবন দিয়েছে, তা সরকার যেন পূরণ করে। রাষ্ট্র বৈষম্যমুক্ত করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে জুলাই শহীদদের যেন বিভক্ত করা না হয় এবং তাদের পরিবারকে বৈষম্যের শিকার হতে না হয়।