প্রকাশ হচ্ছে না কুয়েটে ফেব্রুয়ারি ’২৫ এর ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট
Printed Edition
খুলনা ব্যুরো
- হামলার উদ্দেশ্য ছিল ক্যাম্পাসে রাজনীতি চালু
- তৎকালীন ভিসিসহ প্রশাসন ছিল সহায়তাকারী
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও তাদের বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকদের হামলার ঘটনার শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করেছে। তদন্ত কমিটি গত বছরের ১১ ডিসেম্বর রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। রিপোর্টে ঘটনার জন্য ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতি চালু করার চেষ্টা, তৎকালীন ভিসি প্রোভিসিসহ প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা এবং দুর্নীতিকে দায়ী করে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। তবে রিপোর্ট জমা হওয়ার পর দুই মাস চলে গেলেও রাজনৈতিক চাপে জনসমক্ষে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে কুয়েটের ফেব্রুয়ারি ঘটনা তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুসারে, কমিটির আহ্বায়ক করা হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদকে এবং সদস্য করা হয় বুয়েটের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসরুর আলী ও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানীকে। প্রজ্ঞাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (বর্তমানে উপ সচিব) এ এস এম কাসেমকে তদন্ত কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিতে বলা হয়। কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়, ফেব্রুয়ারিতে কুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণ উদঘাটন ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা চিহ্নিত করা, ভিসির অনুপস্থিতিতে ভার্সিটির কোনো আর্থিক কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়েছে কিনা ও হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি বিষয়ে তদন্ত এবং কুয়েটের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুপারিশ প্রদান করা।
কমিটি তদন্তকালে কুয়েট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর থেকে সংগৃহীত দাফতরিক নথিপত্র ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা, ভার্সিটির ব্যাংক হিসাবগুলোর বিবরণী পর্যলোচনা, ক্যাম্পাস ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের লিখিত বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ইউজিসি ও কুয়েটের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অফিসারদের সাক্ষাৎ ও গোপনীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করেন।
তদন্ত রিপোর্টের সূচনায় বলা হয়, ১৮ ফেব্রুয়ারির সঙ্ঘাত বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা ছিল না বরং একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বহিরাগতদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইন প্রয়েগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের এক গভীর সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি ছিল।
সঙ্ঘাতের মূল কারণ হিসেবে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট কুয়েট সিন্ডিকেট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এ সংঘর্ষের মূল কারণ ছিল ছাত্ররাজনীতি ফের শুরু করার প্রচেষ্টা। ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদলের মতো সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসের বাইরে সাংগঠনিক কার্যক্রম (যেমন সদস্য ফরম বিতরণ) পুনরায় শুরু করার চেষ্টা হয়। সাধারণ ছাত্ররা ক্যাম্পাস রাজনীতিমুক্ত রাখতে ছাত্রদলের এ কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেয়ার লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সমাবেশ ডাকে। ছাত্রদলের লোকজন তাদের উদ্দেশে কটু কাটব্য করলে সংঘর্ষের সূচনা হয়। সাধরণ ছাত্ররা তখন ছাত্রদল কর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। এ পর্যায়ে ছাত্রদল কর্মীরা পকেট গেটের বাইরে ইট পাটকেল ছোড়ে এবং কিছু পরে হেলমেট পরিহিত বহিরাগতরা পিস্তল, রামদা, লোহার রড নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে দেড় শতাধিক জনকে আহত করে। রিপোর্টে মন্তব্য করা হয় এই অনুপ্রবেশ প্রমাণ করে হামলাটি ছিল সুপরিকল্পিত।
রিপোর্টে ছাত্রদল ও স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কর্মীরা সশস্ত্র হামলা চালায় বলে সাধারণ ছাত্ররা দাবি করে এবং পক্ষান্তরে বিএনপি ছাত্রদল একটি গুপ্ত ছাত্র সংগঠন (সম্ভাব্য ছাত্রলীগ) হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছে বলে দাবি করে বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সহিংসতাকারী হিসেবে ছাত্রদলকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক সশস্ত্র কর্মী ও স্থানীয় বিএনপি যুবদল নেতা আবদুল করিম মোল্লা, আনোয়ার হোসেন, ইব্রাহিম হাওলাদার, শফিকুল, রাহুল জাবেদ, ইফাজ ও ইউসুফকে চিহ্নিত করা হয়। রিপোর্টে তৎকালীন কুয়েট প্রশাসনকে (সাবেক ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ ও প্রোভিসি ড. শহীদুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা) ছাত্রদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থতা, আন্দোলন দমনে বিতর্কিত নীতি ও মিথ্যা মামলা সাজানোর (সাধারণ ছাত্রদের বিরুদ্ধে) সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয় তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে অকার্যকারিতা, সময়ক্ষেপণ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করার ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়। রিপোর্টে স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বহিরাগতদের সংগঠিত করা ও সঙ্ঘাত পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি প্রদানের জন্য দায়ী করা হয়।
রিপোর্টে সাবেক ভিসি ড. মাছুদের দুর্নীতিতে জড়িত হয়ে পড়ার বিষয় এবং বিশ^বিদ্যালয়ের ঠিকাদারিতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত ঘটনা রিপোর্টে তুলে ধরেছি। রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটা আমাদের দায়িত্ব নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।