অতিরিক্ত আমদানির কারণে হুমকিতে দেশের লবণশিল্প

৭ লাখ ৭০ হাজার টন ঘাটতি নিয়ে মৌসুম শেষ হলেও এখনো মজুদ ৬ লাখ টনের বেশি!

Printed Edition
3rd-1
চট্টগ্রামের পটিয়ায় ট্রাক থেকে অপরিশোধিত লবণ খালাশ করছেন শ্রমিকরা : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

মৌসুমে উৎপাদন ঘাটতি ছিল সাত লাখ ৭০ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন। ফলে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি থাকার কথা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত মাঠে কৃষকের কাছে অপরিশোধিত লবণের মজুদ ছয় লাখ মেট্রিক টন এবং মিলারদের কাছে আরো দেড় লাখ টনের বেশি। অপর দিকে দেশী লবণশিল্প রক্ষায় সরকারিভাবে বিদেশ থেকে আমদানিও বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ঘাটতির পরও কিভাবে মাঠপর্যায়ে লবণ চাষি ও মিলারদের কাছে এই পরিমাণ মজুদ রয়েছে- সেই প্রশ্ন উঠেছে।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসূমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন। আর উৎপাদন ঘাটতি ছিল সাত লাখ ৭০ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন। ২৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় লবণ উৎপাদন মৌসুম। প্রতি বছর লবণ উৎপাদন মৌসুম শুরু হয় ১৫ নভেম্বর থেকে এবং পরবর্তী বছরের ১৫ মে উৎপাদন মৌসুম শেষ হয়। তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে উৎপাদন শুরু হয় আরো আগে এবং শেষও হয় অনেক পরে। এদিকে মাসে দেশে অপরিশোধিত লবণের চাহিদা রয়েছে দুই লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। সে হিসাবে সঙ্গত কারণে মাঠে মজুদ লবণ অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাঠে অপরিশোধিত লবণের মজুদ রয়েছে ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি এবং মিলারদের কাছেও রয়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন।

জানা গেছে, দেশে শিল্প কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে কসটিক সোডা ও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল যা দেশে তৈরি লবণ দিয়ে তৈরি করা যায় না। কসটিক সোডার জন্য প্রয়োজন হয় সোডিয়াম সালফেট ও অন্যান্য কেমিক্যাল তৈরি করতে প্রয়োজন হয় উন্নত মানের সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) সোডিয়াম সালফেট দেশে উৎপাদন হয় না। অপর দিকে দেশের উৎপাদিত সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্যলবণ) দিয়ে গুণগত মান ভালো না হওয়া কেমিক্যাল তৈরিতে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি হয়। এসব কারণে সরকার কসটিক সোডা ও বিভিন্ন কেমিক্যাল তৈরির জন্য বিদেশ থেকে থেকে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ দেন। আর ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের আড়ালে মিস ডিক্লারেশনের মাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিক লাখ লাখ টন অতিরিক্ত লবণ আমদানি করছেন। ফলে কসটিক সোডা ও কেমিক্যাল তৈরির পরও উদ্বৃত্ত লাখ লাখ মেট্রিক টন লবণ অনায়াসে লবণ কারখানার মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। যার ফলে দেশে লবণ উৎপাদনে ধস নামলেও সঙ্গত কারণে লবন মিল ও চাষিদের কাছে লাখ লাখ টন লবণ মজুদ থেকে যাচ্ছে। একই কারেণে মাঠে উৎপাদিত লবণের পাইকারি মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। গত মৌসুম থেকে চলতি মৌসুমজুড়ে অব্যাহতভাবে উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দরপতন হওয়ার কারণে লবণ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন চাষিরা। ফলে চলতি মৌসুমে (২০২৫-২৬) সময়মতো লবণ উৎপাদনে বেশির ভাগ চাষি মাঠে নামেনি। চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর লবণ মাঠে ৪০ হাজার ১৫০ জন চাষি লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত ছিল বলে জানা গেছে।

লবণ নীতিমালা-২২ এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া ও উৎপাদিত লবণের পাইকারী ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না করা এবং বিদেশ থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কেমিক্যাল তৈরির জন্য সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি বা সঠিক তদারকি না থাকার সুযোগে আমদানিকারকরা অতিরিক্ত লাখ লাখ টন উন্নতমানের সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করেন ও অনায়াসে তা বাজারজাত করছে। যার কারণে মাঠে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লবণচাষিরা।

২০২৫-২৬ মৌসূমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন। আর উৎপাদন ঘাটতি ছিল সাত লাখ ৭০ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন গত মৌসুমেও (২০২৪-২৫) বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হয় (ঘাটতি তিন লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন)। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দেখা দিলে সব ধরনের পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও উৎপাদিত লবণের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত, লবণের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া তো দূরের কথা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বছরজুড়ে চাষিরা গড়ে প্রতি মণে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুনেছেন। বর্তমানে পাইকারি লবণের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণ চাষিদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার চাষিরা অবিলম্বে লবণ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও মাঠে উৎপাদিত লবণের পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া এবং বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে আরো সতর্ক এবং প্রয়োজনে আমদানিকৃত লবণ লিকুইড ফর্মে আনার জন্য দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। না হয় মিসডিক্লারেশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ আমদানি অব্যাহত থাকলে দেশের লবণশিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে।