সম্ভাবনার নতুন বছর
Printed Edition
কাজী জহিরুল ইসলাম
২০২৫ সালে আমাদের বড় প্রাপ্তি ছিল শরিফ ওসমান হাদির রাজনীতিতে আগমন, সবচেয়ে বড় ক্ষতিও বছরের শেষে এসে তাকে হারানো। ৫৪ বছরের বাংলাদেশে যে রাজনীতি গড়ে উঠেছে তা আমাদের কোনো আলোর পথ দেখায়নি। চূড়ান্তভাবে এই রাজনীতি আমাদের একটি পরিবারতন্ত্র উপহার দিয়েছে যার অর্থ হচ্ছে সকল সম্ভাবনার মৃত্যু। এর চেয়ে ভয়াবহ অভিশাপ একটি দেশের জন্য আর কিছু হতে পারে না। যে দেশে ১৮ কোটি মানুষ বাস করে, যে দেশে প্রতি বছর ৩২ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে সেই দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা কে করবে তা নির্ধারিত হয় মাত্র দু’টি পরিবার থেকে! কী ভয়াবহ, কী নির্মম! দেশের অমিত সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করার কী জঘন্য ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল একদল তরুণ, তারা মুখে বলছিল বটে সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন চাই, কিন্তু সেই শব্দের হুঙ্কার দেশের কোটি মানুষের কানে অনূদিত হচ্ছিল, আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার অগ্রাধিকার চাই। এ দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়করা বিশেষ কোনো পরিবার থেকে নয়, উঠে আসবে ৬৮ হাজার গ্রাম থেকে, দেশের যে কোনো ক্ষুদ্র শহর থেকে, মফস্বল থেকে। পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, মেধাই ঠিক করবে কে এবং কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। আমরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানের হাতেই তুলে দিতে চাই দেশের নেতৃত্ব।
কঠিন হলেও ৫৪ বছরের সংস্কৃতি ভেঙে হয়ত রাজনীতি দিয়ে, স্লোগান দিয়ে, কর্মসূচি দিয়ে, রক্ত দিয়ে এই দাবি আদায় করা সম্ভব, দুয়েকবার এ দেশের মানুষ তা করেও দেখিয়েছে কিন্তু এর টেকসই অবস্থা নিশ্চিত করতে হলে দরকার একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। গণমানুষের বোধে এই বিশ্বাস জন্ম নিতে হবে রাষ্ট্রের নায়ক কোনো বিশেষ পরিবার থেকে নয় উঠে আসতে পারে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে, যে কোনো সাধারণ পরিবার থেকে। কেননা রাষ্ট্রের মালিক দেশের সকল মানুষ, বিশেষ কোনো পরিবার নয়। মানুষের মধ্যে এই বৈষম্যমুক্ত বোধ তৈরি করার লক্ষ্যে শরিফ ওসমান হাদি একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ গঠন করেন, যার নাম দেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। একই সাথে তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টে দেয়ার জন্য নিজেই ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। শতভাগ সততা এবং স্বচ্ছতার মধ্যে থেকে পেশিশক্তিহীন, অর্থশক্তিহীন, কর্মীশক্তিহীন, এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও কিভাবে মানুষের ভালোবাসা আদায় করা যায় তা তিনি দেখিয়ে দেন।
সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি মসজিদে, বাজারে, রাস্তায়, মানুষের ঘরে ঘরে ছুটে যান, বিনয়ের সাথে কথা বলেন। শুধু ভোটই চান না, নির্বাচিত হলে কী করবেন সেইসব কথাও বলেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা-৮ আসনে কোনো চাঁদাবাজ থাকবে না। যখন পচা রাজনীতির ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী তখন এই ঘোষণা আমাদের আশার আলো দেখায়। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের সম্পর্কে একটিও নেতিবাচক শব্দ উচ্চারণ না করে কিভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যায় এবং ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যায় সেই দৃষ্টান্ত তিনি তৈরি করেন।
ভিনদেশের আধিপত্যমুক্ত স্বদেশ গড়ে তোলার স্বপ্নকে তিনি বাস্তবে রূপ দেয়ার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। আরো সুস্পষ্ট করে যদি বলি ভারতের আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি ছিলেন আপসহীন এবং অকুতোভয়। তবে তিনি এও বলেন, তার এই যুদ্ধটা দিল্লির বিরুদ্ধে, ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে নয়।
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন একজন কবি। সীমান্ত শরীফ নামে তিনি কবিতা লিখতেন। এক কবিতায় তিনি নিজেকে মৃত এবং তার দেহকে ভক্ষণযোগ্য ঘোষণা করেন। ভিনদেশী পরাশক্তিদের তিনি আহ্বান করেন তাকে ভক্ষণ করার জন্য। নিজের কলিজা, ঊরু সব খেতে বলেছেন শুধু মস্তিষ্কটা খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ওটা খেলে তোমরা দাস হয়ে যাবে। কী অসাধারণ কটাক্ষ, কী নির্মম এক চপেটাঘাত আমাদের দাসত্বপ্রবণ মানসিকতার প্রতি। এই দাসত্ব ইঙ্গিত দেয় গত ৫৪ বছর ধরে দিল্লির দাসত্ব করাকে, ইঙ্গিত দেয় দেশের মানুষের দুই রাজপরিবারের দাসত্ব করার প্রতিও। এই দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমাদের যে দিকনির্দেশনা দরকার ছিল তার সুস্পষ্ট বাতিঘর হয়ে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে ভোরের এক অত্যুজ্জ্বল সূর্যের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি।
হিন্দুরাই শুধু বাঙালি, এ দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠী বাঙালি নয়, পশ্চিমবঙ্গের এই বয়ান তিনি যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন। সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন পদ্মা, মেঘনার মতো বাঙালিদের দু’টি ধারা বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান, পাশাপাশি বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আমাদের সমৃদ্ধির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। তিনি বহুবার বহু জায়গায় বক্তৃতা করে বলেছেন, এটা অন্যায়। ধর্ম এবং পোশাকের কারণে কাউকে লাঞ্ছিত করা যাবে না। রোকেয়া হলে গরুর গোশত রান্না করা নিষিদ্ধ করেছিল হাসিনা সরকার, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হলের অধিকাংশ ছাত্রী মুসলমান, তারা গরুর গোশত খেতে চায়, তাদের আপনি বঞ্চিত করতে পারেন না। বরং এটা নিশ্চিত করা দরকার অন্য ধর্মাবলম্বী যারা আছে, যারা গরুর গোশত খায় না, তারা যেন তাদের ন্যায্য খাবারটা পায়। কী অকাট্য, ন্যায়সঙ্গত যুক্তি।
৫৪ বছর ধরে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় আগাছা জন্মেছে, জঙ্গল তৈরি হয়েছে, জঞ্জাল তৈরি হয়েছে, সেই জঞ্জালের ওপর শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনকালে রোপণ করেছেন অজস্র কাঁটাগুল্ম। চব্বিশের জুলাই মাসে একদল তরুণ এই শ্বাপদশঙ্কুল অরণ্য সাফ করার জন্য হাতে হাতে কাস্তে, কোদাল নিয়ে নেমে পড়েন সমগ্র বাংলাদেশে। তারা শুধু শেখ হাসিনার রোপণ করা কাঁটাগুল্মই সাফ করেননি, নির্মূল করেছেন অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তৈরি করা আগাছাও। সূচনা করেছেন এক অনিন্দ্য সুন্দর বাগানের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই বাগানে জন্ম নিয়েছে কিছু উজ্জ্বল পুষ্প। সবচেয়ে উজ্জ্বল পুষ্পটির নাম শরিফ ওসমান হাদি। হাদির মতো নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, তাসনিম জারা, সাদিক কায়েমসহ অসংখ্য পুষ্প ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে।
এই পুষ্পিত বাগানের সুবাস ভেতরে ভেতরে টের পেলেও প্রকাশ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টির মতো আগাছা উৎপাদনকারী দলগুলো তা মেনে নিতে চাইছে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব, ফ্রান্সে বসবাসরত বাঙালি বুদ্ধিজীবী পিনাকী ভট্টাচার্য যেটিকে নাম দিয়েছেন ‘বর্ষা বিপ্লব’ দৃশ্যত হাসিনাকে বিতাড়িত করলেও তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে উৎখাত করেছে ফ্যাসিবাদী সব বন্দোবস্ত। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করে বিএনপি ঈদের আনন্দ উদযাপন করছে। হাসিনা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা পালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সব অবৈধ দখলদারিত্বের মালিকানা নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। অতীতে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এক দলের প্রতি মানুষ ক্ষিপ্ত হলে অন্যদল ক্ষমতাকেন্দ্রে চলে আসত, সেই সূত্র অনুসরণ করে তারা দখলদারিত্ব করায়ত্ত করেছে এবং তা নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে পাকাপাকি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তারা টের পেলেও স্বীকার করছে না এবার বৈতরণী পার হওয়া ততটা সহজ হবে না। গত এক যুগ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিপ্লব ঘটে গেছে তার প্রভাবে শুধু উন্নত পৃথিবীই বদলে যায়নি বদলে গেছে বাংলাদেশও। এখন সুদূর ঝালকাঠিতে বসবাস করা এক হতদরিদ্র অসহায় বৃদ্ধাও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে কাঁদতে কাঁদতে বলতে পারেন, ‘হাদি আমারে পের্তেক মাসে এক হাজার টাহা দেতে, অহন তো আমারে দেহার আর কেউ থাকলে না’। তার এই কষ্টার্তি মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশের কোটি জনতার কাছে। মানুষ জেনে যাচ্ছে, মির্জা আব্বাস বা সালাহউদ্দিন আহমেদ নয়, এ দেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধু শরিফ ওসমান হাদি। এই মুহূর্তে দেশে বিএনপির সমকক্ষ একটি রাজনৈতিক দল নেই, শেষ বিবেচনায় হয়ত বিএনপি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে উতরে যেতেও পারে, তবে তা খুব একটা সহজ হবে না। একাত্তর প্রশ্নে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে, নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার প্রশ্নে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও সততা ও ইনসাফের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী অতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে তরুণদের দল, জুলাইয়ে নেতৃত্ব দানকারী এনসিপিও।
প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে এ-এক মহাজাগরণ। এই জাগরণই জুলাইয়ের মূল অর্জন, আমাদের নতুন সম্ভাবনা। এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, চব্বিশের জুলাইয়ে বিপ্লবের যে আগুন প্রজ্বলিত হয়েছে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তা খুব সহজেই নিভে যাবে না, এ আগুন খুব সহসাই পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবে বৈষম্যের সব আস্তানা। পরিপূর্ণ বৈষম্যহীন সমাজ, পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে ক্রমশ প্রকম্পিত হতে থাকবে এ দেশের আকাশ, বাতাস, এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের প্রতি ইঞ্চি ভূমি। হ