গাজায় ইসরাইলি দখল অবসান ছাড়া অস্ত্র সমর্পণ করবে না হামাস

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজায় ইসরাইলি দখল অব্যাহত থাকা অবস্থায় নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের শীর্ষ নেতা খালেদ মিশাল। রোববার দোহায় আলজাজিরা ফোরামে বক্তৃতায় তিনি বলেন, দখলদারিত্বের মধ্যে অস্ত্র কেড়ে নেয়া মানে ফিলিস্তিনি জনগণকে ‘সহজ শিকার’-এ পরিণত করা।

হামাসের বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক প্রধান মিশাল বলেন, হামাসের অস্ত্র হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করার দীর্ঘ চেষ্টারই ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, ‘যে জনগণ দখলের মধ্যে আছে, তাদের নিরস্ত্রীকরণ আন্তর্জাতিকভাবে সজ্জিত ইসরাইলের সামনে তাদের পুরোপুরি অসহায় করে তুলবে।’ তিনি জানান, হামাস নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, যার মেয়াদ পাঁচ থেকে ১০ বছর হতে পারে। এতে অস্ত্র ব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা মিলবে এবং পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার পরিবেশ তৈরি হবে। কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এ প্রক্রিয়ায় গ্যারান্টি দিতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী মোতায়েনের কথা থাকলেও ইসরাইল গাজায় প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে অন্তত ৫৭৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মিশাল বলেন, সমস্যার মূল ইসরাইলের দখলদারিত্ব। ‘প্রতিরোধ দখলদার জনগণের অধিকার’-এ কথা উল্লেখ করে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারের আহ্বান জানান।

গাজায় ইসরাইলের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত

কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও আর্টিলারি হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার ভোরে ইসরাইলি আর্টিলারি গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে দফায় দফায় গোলাবর্ষণ করে। একই সময় যুদ্ধবিমান থেকে রাফাহ ও খান ইউনুসের পূর্ব দিকে বিমান হামলা চালানো হয়। খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি হেলিকপ্টার ও স্থলযান থেকেও নির্বিচারে গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। এসব হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির নিয়মিত লঙ্ঘনের অংশ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৭৬ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৫৪৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসন টানা দুই বছর চলেছে। ওই সময়ে অধিকাংশ নারী ও শিশুসহ ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। যুদ্ধবিরতির পরও হামলা অব্যাহত থাকায় গাজাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়ছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব হামলা যুদ্ধবিরতির শর্তের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।

ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা ইসরাইলি বাহিনীর

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। শনিবার গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়া এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। নিহত ব্যক্তির নাম ফারাজ ইব্রাহিম সালেম (৩০)। চিকিৎসা সূত্র জানায়, শুজাইয়া এলাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় এমন একটি অঞ্চল, যেখান থেকে আগে ইসরাইলি সেনারা সরে গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সালেম এমন একটি স্থানে গুলিবিদ্ধ হন, যা চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলি সেনা মোতায়েন ও নিয়ন্ত্রণ এলাকার বাইরে ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের আগেও একই দিনে ইসরাইলি বাহিনী গাজা সিটির পূর্বাংশ এবং উত্তর গাজার জাবালিয়া শহরের পূর্ব এলাকায় গোলাবর্ষণ চালায়। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বে ভবন ধ্বংসের অভিযান পরিচালনা করে ইসরাইলি সেনারা

পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সমন্বিত হামলা

অধিকৃত পশ্চিমতীরে একের পর এক সমন্বিত হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। শনিবার রাতে অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা নাবলুস ও রামাল্লাহর বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলা চালায়। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, নাবলুসের উত্তরে বেইত ইমরিন এলাকায় নিজেদের জমিতে কাজ করার সময় তিন ফিলিস্তিনির ওপর হামলা চালায় সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা। এতে তারা মারাত্মকভাবে আহত হন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, আহতদের একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা শহরেও বসতি স্থাপনকারীদের হামলার খবর পাওয়া গেছে। মধ্য পশ্চিমতীরের রামাল্লাহর পূর্বে রামুন ও দেইর দিবওয়ানের মধ্যবর্তী সড়ক অবরোধ করে দুই ফিলিস্তিনিকে মারধর করা হয়। তাদের একজন মাথায় গুরুতর আঘাত পান। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারি মাসেই পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পত্তির ওপর ৪৬৮টি হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সামরিক অভিযান, বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই সময়ে পশ্চিমতীরে অন্তত এক হাজার ১১২ ফিলিস্তিনি নিহত, ১১ হাজার ৫০০ আহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

পরিচয়হীন লাশ ফেরত : শোকে ভেঙে পড়ছে গাজার পরিবারগুলো

ইসরাইল গাজায় পরিচয়বিহীন ফিলিস্তিনির লাশ ও মানবদেহের অংশ ফেরত দেয়ায় গভীর শোক ও ক্ষোভে ভেঙে পড়েছে পরিবারগুলো। ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, বুধবার গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালে সাদা ব্যাগে করে ৫৪টি লাশ ও দেহাংশ পৌঁছায়, যেগুলোর পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি ইসরাইল। খবর আলজাজিরার।

ফরেনসিক কর্মকর্তা ওমর সুলেইমান জানান, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ১২০টি ব্যাগ হস্তান্তর করেছে, যার মধ্যে ৫৪টি লাশ এবং ৬৬টি ব্যাগে খুলির নমুনা ছিল। চিকিৎসকরা জানান, কয়েকটি লাশে অঙ্গচ্ছেদ ও নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে। আগের বিনিময়গুলোর ক্ষেত্রেও লাশে নির্যাতন ও হত্যার চিহ্ন দেখা গিয়েছিল। আল-শিফা হাসপাতালে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। শাদি আল-ফাইয়ুমি জানান, তার দুই ভাই ১০ মাস আগে খাবার ও পানির সন্ধানে বের হয়ে আর ফেরেননি। অস্পষ্ট ও বিকৃত ছবির মাধ্যমে লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে পরিবারগুলো আরো মানসিক যন্ত্রণায় পড়ছে।

ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হেফাজতে অন্তত ৯৪ ফিলিস্তিনি বন্দী মারা গেছেন, যার প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। পরিচয়হীন লাশ ফেরতের এই প্রক্রিয়াকে মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয়রা।

রাফাহ সীমান্তে চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ অপেক্ষা

গাজা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে খুলে দেয়ার এক সপ্তাহ পার হলেও ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে। রোববার গাজার ভেতর ও বাইরে আটকে থাকা বহু ফিলিস্তিনি সীমান্তে জড়ো হন পারাপারের আশায়, তবে দীর্ঘ বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয় তাদের। আরব নিউজ জানায়, জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত খোলার প্রথম চার দিনে মাত্র ৩৬ জন রোগী চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়তে পেরেছেন, সাথে ছিলেন ৬২ জন সঙ্গী। অথচ গাজায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন।

খান ইউনুসের একটি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে আহত ও রোগীরা ভোরে জড়ো হয়ে রাফাহর পথে রওনা দেন। আহত আমজাদ আবু জেদিয়ানের পরিবার জানায়, সীমান্ত খোলার প্রথম দিন তিনি যেতে পারেননি। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফোন পেয়ে জানতে পারেন, রোববারের দলে তার নাম রয়েছে। সীমান্ত পার হওয়া ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করেছেন, ইসরাইলি বাহিনী এবং ইসরাইল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী আবু শাবাবের দ্বারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা সীমান্ত পরিচালনা করলেও ইসরাইল দূরে নিজস্ব স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ জন রোগী ও ৫০ জন ফেরত আসার কথা থাকলেও বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম মানুষ চলাচল করতে পারছে, যা গাজাবাসীর দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তুলছে।