১৫ লাখ টাকা ঘুষ চাইলেন নিকলীর ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা

Printed Edition

আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো: দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ১৫ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি, অযথা সময়ক্ষেপণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ঠিকাদার সমিতির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দেয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে সেগুলোকে পরিকল্পিত ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

অভিযোগপত্রে উপজেলা ঠিকাদার সমিতির পক্ষে ঠিকাদার আবু সাঈদসহ ১০ জন স্বাক্ষর করেছেন। এর অনুলিপি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা, জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা ঠিকাদার সমিতির কাছেও পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য ঠিকাদারদের কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বিষয়টি স্থানীয় ঠিকাদার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হলেও সিডিউল বিক্রির প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বিভিন্ন অজুহাতে লটারির তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ঠিকাদাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে ১২ কোটিরও বেশি টাকার পে-অর্ডার আটকে রয়েছে। অনেক ঠিকাদার ঋণ নিয়ে প্রতিটি সিডিউলের বিপরীতে প্রায় আট লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন লটারি না হওয়ায় ব্যাংক ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে তাদের।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্প কর্মকর্তা নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকায় টেন্ডার-সংক্রান্ত কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। এমনকি শতকরা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ অর্থ না দিলে তিনি কোনো কাজ করতে আগ্রহী হন না- এমন অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। তাই বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, পাশের কয়েকটি উপজেলায় একই প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হলেও নিকলীতে এখনো কাজ শুরুই হয়নি। তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কারণে পুরো প্রক্রিয়া আটকে আছে। উপজেলার দামপাড়া এলাকার ঠিকাদার হান্নান বলেন, ‘টাকার জন্য তিন মাসের বেশি সময় ধরে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ঠিকাদাররা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জারইতলা ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য বলেন, ‘৪০ শতাংশ অর্থ ছাড়া কোনো কাজের বিল তোলা যায় না। সবাই নীরবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’ আরো কয়েকজন ইউপি সদস্যও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ওই পিআইওর বিরুদ্ধে।

ঠিকাদার আবু সাঈদ দাবি করেন, প্রথম ধাপে মাত্র তিনটি পূর্ণাঙ্গ দরপত্র জমা পড়ায় তিনি যোগ্য ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ধাপে ২৫০টি সিডিউলের মধ্যে ১৪৯টি জমা পড়ে। এরপর কর্মকর্তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি ১৫ লাখ টাকার কমে রাজি হননি। ঠিকাদার আবু সাঈদ উল্লেখ করেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন, তার হাত অনেক লম্বা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের নানা ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।’

তবে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো: দেলোয়ার হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে ৫৮টি সিডিউল বিক্রি হলেও নেগোসিয়েশনের কারণে মাত্র একটি পূর্ণাঙ্গ দরপত্র জমা পড়ে, বাকিগুলো অসম্পূর্ণ ছিল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এ কারণেই একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন বলেন দাবি তার।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, অভিযোগপত্র তিনি পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।