হাতের লেখা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার মন্তব্যে উত্তাপ
‘এক শ’ পারসেন্ট এটি আমার হাতের লেখা। অনেক জায়গায় বসার কোনো জায়গা ছিল না তখন আমাকে দাঁড়িয়ে এক হাতের উপর খাতা রেখে আরেক হাতে লিখতে হয়েছে।’
Printed Edition
মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জব্দ তালিকার হাতের লেখা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার (৬ অক্টোবর) উত্তপ্ত বিতর্ক দেখা দেয়। মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীর দাবি করেন, ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের দু’টি জব্দ তালিকাই তার নিজের হাতে লেখা, যদিও লেখার ধরনে পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শেখ হাসিনার মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীরকে জেরার সময় এমন দাবি করেন তিনি। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ৫৪তম বা সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন এই তদন্ত কর্মকর্তা।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীরকে জেরা করার সময় জব্দ তালিকার হাতের লেখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন। তদন্ত কর্মকর্তা তখন দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘ইহা সত্য নয় যে, ১৬-০২-২০২৫ খ্রি: এবং ২২-০২-২০২৫ খ্রি: তারিখের জব্দ তালিকা ভিন্ন ভিন্ন হাতের লিখা।’ হাতের লেখার ভিন্নতা প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা দেন, ‘এক শ’ পারসেন্ট এটি আমার হাতের লেখা। অনেক জায়গায় বসার কোনো জায়গা ছিল না তখন আমাকে দাঁড়িয়ে এক হাতের উপর খাতা রেখে আরেক হাতে লিখতে হয়েছে।’
এ সময় আইনজীবী আমির হোসেন আদালতকে হাতের লেখা পরীক্ষা করে দেখার অনুরোধ জানালে আদালত তার কাছে জানতে চান, ‘হাতের লিখা দিয়ে আপনি কী প্রমাণ করতে চান?’ জবাবে আমির হোসেন বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় সবসময় তদন্ত কর্মকর্তার নিজের হাতে লিখে। এখানে এর ব্যত্যয় ঘটেছে এটাই আমি আনতে চাচ্ছি।’ আইনজীবীর এই যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেন, ‘এই আইন আর এখন চলে না। এখন হাতে লেখার পরিবর্তে অনেকে টাইপ করেন।’ অর্থাৎ, আদালতের মতে আধুনিক তদন্ত প্রক্রিয়ায় দালিলিক কাজ হাতে লেখাই বাধ্যতামূলক নয়।
আদালতের এই মন্তব্যের পর মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘এক শ’ পারসেন্ট সত্য যে, এটি আমার লেখা।’ এই পর্যায়ে প্রসিকিউটর মিজানুর রহমান বলেন, ‘সাক্ষী যখন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, তখন সেখানে আমাদের আর কোনো কথা থাকতে পারে না।’
অন্য একটি প্রসঙ্গে সাক্ষীর উদ্দেশে আমির হোসেন বলেন, আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে চাননি; বরং আমার মক্কেল শেখ হাসিনা ও কামালকে ফাঁসাতে আপনি ও তদন্ত সংস্থার অন্য সদস্যদের প্ররোচনায় তিনি এ কাজটি করেছিলেন। জবাবে এসব সত্য নয় বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর। তিনি বলেন, নিজের ইচ্ছায় জবানবন্দী দিয়েছেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আমি বা তদন্ত সংস্থার অন্যান্য সদস্য কোনো ধরনের প্ররোচনা দিইনি। শেখ হাসিনার এই আইনজীবীর ভাষ্যমতে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে বহুসংখ্যক মানুষ নিহত-আহত হয়েছেন। কিন্তু জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে গুটিকয়েক ভুক্তভোগী পরিবারের। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রায় এক হাজার ৫০০ জন নিহত ও ২৫ হাজার ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। তাদের সব পরিবারের সাথে কথা বলতে পারিনি। তবে অনেকের সাথে বলেছি। এর মধ্যে শহীদ পরিবারের ১০ জন এবং আহত পরিবারের ২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
একপর্যায়ে এ মামলায় দাখিলকৃত জব্দ তালিকার তথ্যগুলো অসত্য বলে দাবি করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন। জবাবে এটা সত্য নয় বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এ ছাড়া আমার দেশ পত্রিকায় অসত্য প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে অভিযোগ তুলে সাক্ষীকে প্রশ্ন করেন এই আইনজীবী। কেননা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মামলায় কারাভোগ করেছেন মাহমুদুর রহমান। এ জন্য শত্রুতাবশত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি এ কাজ করেছেন। একই সাথে ২০ ও ২১ এপ্রিল জব্দকৃত মোট ১৯টি ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) তৈরি বলেও দাবি করেন তিনি।
জবাবে এসব সত্য নয় বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীর। তিনি বলেন, এসব ভিডিও এআই জেনারেটেড ছিল না।
এ দিন দুপুর পৌনে ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জেরা চলে। মাঝে কিছুক্ষণ বিরতি দেয়া হয়। তবে জেরা শেষ না হওয়ায় মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। অবশিষ্ট জেরা আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, তানভীর হাসান জোহা, ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যরা।
এ দিকে এ মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছে। ৩৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এরই মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। তবে নিজের দায় স্বীকার করে আগেই হয়েছেন রাজসাক্ষী।
আবু সাঈদ হত্যা : ফের সাক্ষ্য গ্রহণ ১৩ অক্টোবর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে নবম দিনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৩ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। অন্য সদস্যরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এ দিন বেলা সোয়া ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ চলে। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেন পুলিশের দুই উপ পরিদর্শক (এসআই)। তারা হলেন- এসআই রফিক ও এসআই রায়হানুল রাজ দুলাল। দু’জনই জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। পরে তাদের জেরা করেন পলাতক ২৪ আসামির পক্ষে চার স্টেট ডিফেন্সসহ গ্রেফতারদের আইনজীবীরা। এখন পর্যন্ত এ মামলায় মোট সাক্ষ্য দিয়েছেন ১২ জন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম ও আবদুস সোবহান তরফদার। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। এর আগে, ২৯ সেপ্টেম্বর অষ্টম দিনের মতো সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়। ওই দিন জবানবন্দী দিয়েছেন তিনজন। ২২ সেপ্টেম্বর সপ্তম দিনে প্রথমে ছয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়া সিয়াম আহসান আয়ানকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ২১ সেপ্টেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্য দেন আয়ান। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনিই আবু সাঈদকে হাসপাতালে নিতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন। নিজের সাক্ষ্যতেও পুরো বর্ণনা তুলে ধরেছেন এই সাক্ষী। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পঞ্চম দিনের মতো জেরা শেষ হয়। ওই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার লাইব্রেরিয়ান আনিসুর রহমানকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দিনে পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তিনি। একই দিন এসআই মো: তরিকুল ইসলামও জবানবন্দী দিয়েছেন।
৮ সেপ্টেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্য দেয়া রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: রাজিবুল ইসলামের জেরা শেষ করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ৭ সেপ্টেম্বর তিনি জবানবন্দী দেন। ওই দিন দ্বিতীয় সাক্ষী রংপুরে কর্মরত এনটিভির সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এ কে এম মঈনুল হককেও জেরা করা হয়।
গত ২৮ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের জবানবন্দীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ। একই দিন সাংবাদিক মঈনুল হকও সাক্ষ্য দেন।
এ মামলার গ্রেফতার ছয় আসামি হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।
গত ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে ফর্মাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে এ মামলায় বেরোবির সাবেক ভিসিসহ ২৪ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের পক্ষে গত ২২ জুলাই সরকারি খরচে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়।
গত ৩০ জুলাই পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত চার আইনজীবী। এর মধ্যে পাঁচজনের হয়ে লড়েন আইনজীবী সুজাত মিয়া। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মামুনুর রশীদ। এ ছাড়া শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান ও শহিদুল ইসলাম। ২৯ জুলাই তিন আসামির পক্ষে শুনানি হয়। এর মধ্যে শরিফুলের হয়ে লড়েন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। কনস্টেবল সুজনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু ও ইমরানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সালাহউদ্দিন রিগ্যান। ২৮ জুলাই এ মামলার ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শেষ করেন প্রসিকিউশন। ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। আর ২৪ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। এ মামলায় মোট সাক্ষী ৬২ জন।