পর্দা নামল একুশে বইমেলার বিক্রি প্রায় ১৭ কোটি টাকার

Printed Edition
back-4
একুশে বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিজয়ীদের সাথে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী : নয়া দিগন্ত

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক

পর্দা নামলো একুশে বইমেলার। গতকাল সমাপনী অনুষ্ঠানে গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে এবারের মতো শেষ হলো একুশে গ্রন্থমেলার। এবারের বইমেলায় ১৭ দিনে আট কোটি টাকার বই বিক্রির তথ্য দিয়েছে ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। আর বইমেলার তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েছে এক হাজার ৭৭১টি বই। মেলা পরিচালনা কমিটি বলছে, গড় হিসাব করলে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ ১৭ কোটি টাকার মতো দাঁড়াতে পারে। অন্য দিকে বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই বিক্রি করেছে। বইমেলায় অংশগ্রহণকারী সর্বমোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে ৫৭০টি।

মেলা পরিচালনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বেশি সংখ্যক ইউনিট বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম সংখ্যক ইউনিট বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ বেশি। মেলায় বাংলা একাডেমিসহ সকল প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে।

বইমেলার তথ্যকেন্দ্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এবার ১৭ দিনে এক হাজার ৭৭১টি নতুন বই তথ্যকেন্দ্রে জমা হয়েছে। প্রকাশিত সকল বই তথ্যকেন্দ্রে জমা না হওয়ায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। মোড়ক উন্মোচন হয়েছে মোট ২৫২টি বইয়ের।

এবার মেলা হয়েছে ১৮ দিন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রোজার কারণে নির্ধারিত তারিখ থেকে পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হয়। বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। বইমেলার সকল আয়োজন মেলার মূল প্রতিপাদ্যের আলোকে সাজানো হয়।

গত বছর মাসব্যাপী বইমেলায় অংশ নেয়া অর্ধেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রির তথ্য দিয়ে মেলা কমিটি জানিয়েছিল, বই বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি টাকার মতো। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির তথ্য এক বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছিল মেলা পরিচালনা কমিটি। গত বছর বইমেলায় মোট ৭২১টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক ছিল। বাকি ৭০৩টি ছিল প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান। সেই হিসাবে এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। ২৮ দিনের মেলা এবার ১৮ দিন হওয়ায় মেলার দিনও কমেছে। এর আগে ২০২৪ সালে মেলায় বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার বই। ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার বই।

এবার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৬৮ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। কোনো প্রকাশনা সংস্থাকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়নি। লিটলম্যাগাজিন চত্বরের অবস্থান ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছে। এই চত্বরে ৯০টি লিটলম্যাগ স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান স্টল ভাড়ার বাবদ অর্থ জমা দিয়েছে, তাদের অর্থ ফেরত দেয়া হচ্ছে। এ বছর শিশু চত্বর মূলমেলার মধ্যে, অর্থাৎ মুক্ত মঞ্চের সামনে বড় পরিসরে রাখা হয়, যেন শিশুরা অবাধে বিচরণ করতে পারে এবং তাদের কাক্সিক্ষত বই সহজে সংগ্রহ করতে পারে।

বইমেলায় প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছিল। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য আবৃত্তি, সঙ্গীত ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। বইমেলার শিশুচত্বরে ছিল পাপেটশো এবং বায়োস্কোপের আয়োজন, যা শিশুরা দারুণভাবে উপভোগ করেছে।

বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে মেলার প্রতিবেদন পাঠ করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব সেলিম রেজা। স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, এবার নতুন বই বেরিয়েছে অনেক কম। সেটা নানান বাস্তবতার কারণেই ঘটেছে। আগামী কয়েক বছর রোজা থাকবে। ফলে রোজা এবং ফেব্রুয়ারিকে সমন্বয় করে কিভাবে আগামী বছর মেলা হবে, তা নিয়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হবে। আগামীর বইমেলা নতুন রূপে প্রত্যাশা জাগাবে, এই আশা করছি।

গতকাল শেষ দিনে মেলা শুরু হয় বেলা ২টায়। গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাত ৯টায় সমাপ্তি ঘোষণা হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মফিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার, সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেয়া হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে মো: মফিদুর রহমান বলেন, এবারের বইমেলা ছিল পূর্বের মেলাগুলোর তুলনায় অধিক পরিচ্ছন্ন। মেলায় প্রকৃত পাঠকদের উপস্থিতি ছিল বেশি। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্যে ভালো মানের বই এবং আনন্দদায়ক আয়োজনের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করার কথা আমাদেরকে ভাবতে হবে।

নিতাই রায় চৌধুরী এমপি বলেন, আমরা এমন একটি অন্তভুর্ক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মাঝেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়, অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে সেটিই মানসম্পন্ন বই।

এ বছর পুরস্কার প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার কথাপ্রকাশ। মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ঐতিহ্য, প্রথমা প্রকাশন এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড; রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড, সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার সহজ প্রকাশ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ এবং বেঙ্গলবুকস।