আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না মেসিকে

ক্রীড়া ডেস্ক
Printed Edition
khela-1
২০২৬ বিশ্বকাপে মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে জয়ের পর আবেগী লিওনেল মেসি : ইন্টারনেট

প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়েরের বার্তা

জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা জানানোর পর সতীর্থ, সাবেক খেলোয়াড় ও ভক্তদের পাশাপাশি মেসিকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ের মিলেইও। মেসির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ইনস্টাগ্রামে আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে উদ্দেশ্য করে মেসির একটি ছবি নিজের পোস্টে শেয়ার করে সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগঘন বার্তায় মিলেই লেখেন, ‘অনেক অনেক ধন্যবাদ, অসম্ভবকে সম্ভব করা মানুষ।’

আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন মহাতারকা লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত পরশু ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি তার দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা জানান। ছোট্ট একটা ঘোষণা ‘বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে এত দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে, আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি...।’

এই বিদায়ী বার্তাটি লিখেছিলেন গত বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ গোলে হারের ঠিক দুই দিন পর। গত ৮ আগস্ট মেসির বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার মনের দৃঢ়তা আরো বেড়ে যায় বলে জানান মেসি।

ভক্তদের উদ্দেশে মেসি লিখেন, ‘নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি, আমার দেয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া প্রাপ্য। আমি জাতীয় দলের অংশ হতে সব সময় ভালোবেসেছি এবং আজীবন ভালোবাসব। তবে এখন সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।’

মেসির অবসরের ঘোষণায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া মাধ্যমগুলো মেসিকে ফুটবলের বরপুত্র ও ‘অমর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস লিখেছে, মেসিকে নিয়ে বিশ্ব কেঁপে উঠেছে, তিনি অমর হয়ে থাকবেন। সতীর্থ ও গ্রেটরাও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও ইংলিশ কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। লিনেকার লিখেছেন, ‘তুমি শুধু খেলোনি, দুই দশক ধরে কোটি মানুষের স্বপ্ন বয়ে বেড়িয়েছ।’

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির ২১ বছর বয়সী সতীর্থ নিকো পাজ ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘না, লিওওও। তোমার দেয়ার মতো আরো অনেক বাকি আছে।’

মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে স্মরণ করেছেন ২০১৬ সালে মেসির প্রথমবার জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়ার মুহূর্ত, ‘লিও, তুমি যখন জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলে, তখন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি তখন অল্প বয়সী, তোমার সাথে কখনো এক দল হয়ে খেলার সুযোগ পাবো কি না- সেটা বুঝতে তোমার বয়সের সাথে নিজের বয়স মিলিয়ে হিসাব কষতাম। কথাটা বোকার মতো শোনাতে পারে, কিন্তু আমি সত্যিই তা-ই করতাম... ভাগ্য ভালো যে তুমি ফিরে এসেছিলে... আমি শুধু তোমার সাথে খেলার সুযোগই পাইনি; আমরা এক সাথে ক্যাম্প করেছি, একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নিয়েছি, কঠিন সময় পার করেছি, অবিশ্বাস্য সব মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত আমরা এক সাথে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’

ফার্নান্দেজ লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া পরবর্তী জাতীয় দলের ক্যাম্পের কথা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’

মেসির ‘দেহরক্ষী’ খ্যাত মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘দেশের প্রতি তোমার ভালোবাসা, কখনো হার না মানতে ভেতরের লড়াই, অবিচার সহ্য করার শক্তি এবং সব খেলোয়াড়ের প্রতি মানবিকতা- সব কিছুর জন্য শুধু ধন্যবাদ। সর্বকালের সেরা, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যে আমাদের মুখে কত হাসি ফুটিয়েছ। তুমি অমর।’

লাওতারো মার্টিনেজ ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘লিও, তুমি আমাদের জন্য যা করেছ, কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো যথেষ্ট শব্দ আমার জানা নেই। জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে তুমি আমাদের জন্য যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছ, সেটিই ছিল আসল... আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’

মেসির সাবেক সতীর্থ অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া লিখেছেন, ‘চিরকালীন ধন্যবাদ, অধিনায়ক’। লিয়ান্দ্রো পারেদেস লিখেছেন, ‘ভেবেছিলাম, এই খবরের জন্য আমি প্রস্তুত। কিন্তু স্পষ্টতই তা নই। একজন আর্জেন্টাইন, জাতীয় দলের সমর্থক, একজন সতীর্থ এবং বন্ধু হিসেবে তুমি আমার জন্য যা করেছ, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! তোমার অবদান এবং খেলোয়াড় হিসেবে মহানুভবতা, সবার ওপরে একজন মানুষ হিসেবে তুমি অসাধারণ।’

আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মেসি জিতেছেন কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ। ব্যক্তিগত অর্জনে নিজেকে নিয়ে গেছেন আরো ওপরে। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। শুরুর পথটা অবশ্য মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়। একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার ব্যর্থতার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। এমনকি ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য ফিরে এসে বদলে দেন পুরো গল্প।

মেসির আন্তর্জাতিক সাফল্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ে। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটান তিনি। ২০২৪ সালে আরো একটি কোপা আমেরিকা। ফলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা ও অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে।

পরিসংখ্যানেও আর্জেন্টিনার সবার ওপরে মেসি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচে কম অর্জন নেই অনেকের চোখেই সর্বকালের সেরা এই ফুটবলারের। আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়েছেন মেসি। আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে ১২৫ আন্তর্জাতিক গোল আছে রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকার। করেছেন ১১টি হ্যাটট্রিক আর আছে ৬৮ গোলে অবদান। তিনিই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল করা ফুটবলার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার দীর্ঘ যাত্রা শুধু সংখ্যায় নয়, আবেগ ও সাফল্যের দিক থেকেও অনন্য।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে এক অবিশ্বাস্য যুগের শেষ হলো মেসির অবসরে। যে খেলোয়াড় একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা না জেতার ব্যর্থতায় সমালোচিত ছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ এনে হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় নায়ক। তার বিদায় হয়তো প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক আবেগঘন মুহূর্ত।