সাক্ষাৎকার : ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ

২৪ ঘণ্টায় আরাকান দখলের কথা বলার তিন দিনেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হয়

Printed Edition
Font-4

রাশিদুল ইসলাম

লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব :) অলি আহমেদ বলেছেন, বর্তমান সরকার এখনো নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে পারেনি। বরং কালোটাকার মালিকদের মনোনয়ন বৈধ করার প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মনোনয়ন যাচাইয়ের বৈঠকে প্রার্থীর বক্তব্য শুনেই অনেক েেত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে, যা নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক শক্তির পতনের পর যে ব্যতিক্রমী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এমন অনিয়ম আমরা আশা করিনি।

এলডিপি সভাপতি অভিযোগ করেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি বা কর না দেয়ার অভিযোগ ওঠার পর চার ঘণ্টার জন্য বৈঠক মুলতবি করে আবার বৈঠকে বসে সেই প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে। অথচ আইন অনুযায়ী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই সব ধরনের দেনা-পাওনা পরিশোধ করতে হয়। চার ঘণ্টার মধ্যে কর বা ঋণ পরিশোধ করলেও তা নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অলি আহমেদ বলেন, এসব ঘটনা প্রকাশ্যেই ঘটছে। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কমিশনের সচিব এবং দুদকের চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘জীবন দুইটা না- জীবন একটাই। কাপুরুষের মতো কিংবা কারো দাস হয়ে জীবন কাটিয়ে কোনো লাভ নেই। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করুন। দরখাস্তের অপোয় বসে না থেকে যেখানে ভুল দেখবেন সেখানে হস্তপে করুন। আপনাদের সেই মতা আছে। দেশটাকে বাঁচান। কোনো দলের সেবাদাস বা কোনো নেতার দাস হিসেবে কাজ করবেন না। আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবেন-এই দায়বদ্ধতা থেকেই কাজ করুন।’

আগামী নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে। যারা দেশদ্রোহী নয়, চাঁদাবাজ নয়, নারীলোভী নয়, অর্থলোভী নয়- এমন সৎ, দ ও শিতি মানুষ যেন নির্বাচিত হয়। জনগণকে সচেতন থাকতে হবে, যেন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল না মারে।

দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এই সাাৎকারে অলি আহমেদ আরো বলেন, বাংলাদেশ আর কোনোভাবেই অধীনস্ত রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে না- এটি ভারতকে বুঝতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসন, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

নয়া দিগন্ত : অতীতে আপনার সরকারের সময় রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে আপনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন। মিয়ানমার তখন তাদের জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু গত দেড়-দুই দশকে সঙ্কট আরো জটিল ও বিপর্যস্ত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো বাস্তব পথ আছে কি?

অলি আহমেদ : বেগম খালেদা জিয়া যখন ফরেন মিনিস্টারের মাধ্যমে আমাকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের দায়িত্ব দেন, তখন আমি তাকে পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম- এই বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেবো, সেগুলো নিয়ে যেন আমাকে বারবার প্রশ্ন করা না হয়। আমাকে কাজগুলো গুছিয়ে নিতে দিতে হবে। আমি এমন কোনো পদপে নেবো না, যা দেশের স্বার্থের তি করে।

প্রথমেই আমি এয়ারফোর্স চিফের সাথে বৈঠক করে বলি, ১২টি ফাইটার বিমান কক্সবাজারে মোতায়েন করতে। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল নাসিম- তাকে চট্টগ্রাম ডিভিশনকে টেকনাফ সীমান্তে মোতায়েন করার নির্দেশ দিই। নৌবাহিনীকেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলি। এরপর আমি মিয়ানমারে যাই। আমার সাথে ছিলেন রাষ্ট্রদূত ফারুক।

বৈঠকে বসার আগে রাষ্ট্রদূতকে আমি বলে দিই- কোনো প্রয়োজনে আপনাকে ডাকব, তবে আলোচনায় আপনি অংশ নেবেন না।

আমি মিয়ানমার যাওয়ার আগেই ইউএনএইচসিআরের প্রধান মিসেস ওগাটা বিশেষ বিমানে রোববার ছুটির দিনে ঢাকায় আসেন। তার সাথে ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বি. মাইলাম। তারা আমার বাসায় এসে বলেন, মিয়ানমারে যেন ইউএনএইচসিআর কাজ করার অনুমতি পায়, সেই ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে। মিসেস ওগাটা আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি জানি, তুমি সফল হবে।’ আমি তাকে বলি, ‘ডান, করে দেবো।’

মিয়ানমারে পৌঁছে আমাকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়। তখন সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের পদবি ছিল ‘স্লর্ক’-স্টেট ল অ্যান্ড অর্ডার রিস্টোরেশন কাউন্সিল। থান শুয়ের সাথে আমার বৈঠক হয়। শুরুতে কূটনৈতিক ভাষায় আলোচনা চলছিল।

একপর্যায়ে আমি তাকে বলি, আপনি যদি সম্মতি দেন, তাহলে আমি আমেরিকাকে অনুরোধ করব যেন ইউএনএইচসিআর এখানে কাজ করতে পারে। কারণ বাংলাদেশ থেকে যারা ফেরত আসবে, তাদের খাবার, ঘরবাড়ি, পুনর্বাসনের বিশাল ব্যয় আপনাদের একার পে বহন করা সম্ভব নয়।

তিনি তখন বৃদ্ধাঙ্গুলি তুলে কড়া ভাষায় বলেন, ‘আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট আমেরিকা।’ পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে আমাকে পেছনে সরে যেতে হয়, নইলে তার আঙুল আমার নাকে লেগে যেত।

আমি তখন বলি, ‘এক্সেলেন্সি, এখন মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন। আমি ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, যুদ্ধে আমার ভাইদের জীবন গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। আপনি কি আমার বায়োডাটা পড়েছেন?’ তিনি বলেন, না পড়েননি।

আমি তখন বলি, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি আপনার আরাকান স্টেট দখল করে নেবো। আমার ডিভিশন প্রস্তুত, এয়ারফোর্স ও নেভি প্রস্তুত। আপনি কী করবেন? আপনার তো এখানে পৌঁছাতে হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। আপনি পৌঁছানোর আগেই আমি এলাকা দখল করে ফেলব। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আই হ্যাভ ফিনিশড মাই ডিসকাশন উইথ ইউ।’

এই কথা বলে আমি উঠে বের হয়ে আসি। বৈঠকে উপস্থিত একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন তাদের ফরেন মিনিস্টার। তিনি ভয়ে কাঁপছিলেন। বাইরে এসে আমাকে বললেন, ‘ভাই, আমি একমাত্র সিভিলিয়ান, বাকিরা সবাই জেনারেল আর ব্রিগেডিয়ার। আজ মনে হয় আমার চাকরিটা গেল।’

আমি তাকে বললাম, ‘আমি দুঃখিত। কিন্তু আই লাভ মাই কান্ট্রি। দেশের জন্য আমি যুদ্ধ করেছি। দেশকে ভালো না বাসলে আমি বেঈমান, আমি মুনাফেক। দেশের ঊর্ধ্বে আমার কাছে আর কিছু নেই। যা বলার দরকার ছিল, আমি বলেছি। আরাকান আমাদের নিতে হবে- এটা চট্টগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা আমি আপনার রাষ্ট্রপ্রধানকেও বলেছি।’

এরপর আমি রেস্ট হাউজে ফিরে আসি। আমার স্ত্রী সাথে ছিলেন। বিকেলে আত্মীয়স্বজন আমাদের সাথে দেখা করতে আসার কথা ছিল। দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, হঠাৎ দরজায় নক। অবাক হলাম- এখানে তো কেউ নক করার কথা নয়। গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা অবস্থায় দরজা খুলে দেখি সিকিউরিটি সদস্য দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, ‘স্যার, আপনার জন্য ফোন এসেছে।’

আমি বললাম, আমাকে তো কেউ ফোন করার কথা না। তিনি বললেন, ‘ফরেন মিনিস্টার ফোন করেছেন’। আমি বললাম, তাকে একটু লাইনে থাকতে বলুন, কাপড় পরে আসছি।

ফোনে ফরেন মিনিস্টার আমাকে বললেন, ‘সব ঠিক আছে। কিন্তু এখন আমি জানতে চাই- তুমি আসলে কে?’ আমি বললাম, ‘আপনি তো জানেন আমি যোগাযোগমন্ত্রী। তবে আমার আসল পরিচয়- আমি ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ।’

তিনি বললেন, ‘তুমি যে এভাবে একটা হিমালয়ের পাহাড় গলিয়ে দেবে, এটা আমি কল্পনাও করিনি।’ আমি জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? তিনি বললেন, ‘অল অ্যাগ্রিড। দুই-তিন দিনের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। ইউএনএইচসিআরকে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, আমি মলমিংয়ে আমার পীর সাহেবের মাজার জিয়ারত করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আগে অনুমতি দেয়া হয়নি। এবার রাষ্ট্রপতির জন্য ব্যবহৃত এফ-২৭ বিমানটি পুরো দিন আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য একটি ডিভিশন মোতায়েন থাকবে। প্রায় ১২ থেকে ১৬ হাজার সেনা আমাকে পাহারা দিয়ে সেখানে নিয়ে যায়। আমি জিয়ারত করে নিরাপদে ফিরে আসি। এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য একটাই- সব সময় সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না। কখনো কখনো আঙুল বাঁকা করতেই হয়, তবেই ফল পাওয়া যায়।

নয়া দিগন্ত : পার্বত্য চট্টগ্রাম, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি- এই তিনটি ইস্যু কিভাবে পরস্পরের সাথে যুক্ত?

অলি আহমেদ : পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কৌশলগত হৃৎপিণ্ড। এখানে অস্থিতিশীলতা থাকলে সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল হয়, মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার বাড়ে। একই সাথে বিদেশী শক্তির অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে নয় ন্যায়বিচার, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন এবং কার্যকর প্রশাসনের মাধ্যমে স্থিতিশীল করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু বছর ধরে প্রশাসনিক দ্বৈতশাসন, রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়হীনতা চলছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রাষ্ট্র যদি এখানে শক্তিশালী ও ন্যায্য ভূমিকা নিতে না পারে, তাহলে এই অঞ্চল ভবিষ্যতে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

নয়া দিগন্ত : নির্বাচন কমিশনের দুর্বল ভূমিকার কারণেই কি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?

অলি আহমেদ : নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ইতোমধ্যেই উঠেছে। গত সাত দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেখানে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। ইউনূস সাহেব নিজেও তা ভঙ্গ করছেন, সরকার ভঙ্গ করছে। জনগণও ভঙ্গ করছে। কিন্তু মূল দায় সরকারের। কাউকে চেয়ারে বসানো হচ্ছে, কাউকে মাটিতে। এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ সরকার করতে পারে না। সরকারকে এসব বিষয় কঠোরভাবে নজরে নিতে হবে।

নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক শক্তি যেন আবার ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে- এই আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। নির্বাচিত সরকার ভবিষ্যতে এটি কিভাবে মোকাবেলা করতে পারে?

অলি আহমেদ : প্রশ্ন হলো- কারা নির্বাচিত হয়ে মতায় আসবে? যারা অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করেছে বা এখনো তাদের সহায়তা নিচ্ছে, তারা মতায় এলে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না, বরং আরো খারাপ হবে। জনগণকে এমন লোকদের নির্বাচিত করতে হবে যারা আল্লাহকে ভয় করে, সুশাসন চায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, চাঁদাবাজি ধ্বংস করতে চায়, দুর্নীতি বন্ধ করতে চায় এবং শিা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আন্তরিক। যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের মানুষ যাতে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হয়, সে জন্য অন্তত চারটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কিন্তু আমরা এখনো সেই পথে এগোচ্ছি না। বরং কিভাবে রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়- সেই মানসিকতা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

নয়া দিগন্ত : আপনি ‘নিজের পায়ে কুড়াল না মারার’ আহ্বান জানিয়েছেন-

অলি আহমেদ : নির্বাচনে দল নয়, মার্কা নয়- যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে। প্রার্থীর শিাগত যোগ্যতা, দতা, সততা ও দেশপ্রেম দেখতে হবে। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। যে মুসলমান দেশকে ভালোবাসে না, তার ঈমান পূর্ণ হয় না। আমরা যদি বেহেশতে যেতে চাই, তাহলে দেশপ্রেম থাকতে হবে। টাকার লোভে যেন আমরা ভোট বিক্রি না করি। আমরা গরু-ছাগল নই, আমরা রাসূল সা:-এর উম্মত, আদমের সন্তান।

যে দলেরই হোক না কেন, সবচেয়ে যোগ্যপ্রার্থীকে ভোট দিলে দেশ এগিয়ে যাবে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, সশস্ত্রবাহিনী ও সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের উদ্দেশে অতীত ভুলে নতুন করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। বেঈমানি ও মুনাফেকির আশ্রয় নেয়া যাবে না।

নয়া দিগন্ত : ভবিষ্যৎ সরকার দুর্নীতি ও পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোর অব্যবস্থাপনা কিভাবে মোকাবেলা করবে?

অলি আহমেদ : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনের আগে প্রত্যেক সদস্যের দীর্ঘ সময়ের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হয়েছিল। ভবিষ্যতেও দায়িত্ব দেয়ার আগে দেখতে হবে কেউ দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি বা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল কি না। আমাদের দেশের অনেকেই বিদেশী গোয়েন্দাদের দালালি করেন- এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষকে সঠিক পথে চলতে হবে, যে পথ আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন এবং নবী করিম সা: দেখিয়েছেন। চাকরি চলে যেতে পারে, জীবনও যেতে পারে- কিন্তু অন্যায়ের পথে চলা যাবে না। সন্তানদের জন্য চুরি করলে তারাই কিয়ামতের মাঠে প্রথম সাী হবে। আল্লাহভীতি থাকলে কেউ দুর্নীতি করতে পারে না।

নয়া দিগন্ত : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেখান থেকে এখনো রাজনৈতিক নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শাসনামলে বাংলাদেশ কার্যত ভারতের ডিক্টেশনে পরিচালিত হয়েছে- এমন সমালোচনাও রয়েছে। এখন রাজনৈতিক সহাবস্থানের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই পরিবর্তনের প্রোপটে ভারত ও শেখ হাসিনার সম্ভাব্য অপচেষ্টা কিভাবে মোকাবিলা করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

অলি আহমেদ : প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত একটি বড় রাষ্ট্র। তাদের প্রথমে এটা উপলব্ধি করতে হবে- বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেটি কখনো কারো শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভারতবিরোধী অবস্থানে চলে গেছে। কিছু সুবিধাভোগী বড় শ্রেণীর দালাল ছাড়া সাধারণ মানুষ আজ ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। কেন এই অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা ভারত সরকারকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।

ভারতের চারপাশে তাকালে দেখা যায়- শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল- প্রায় সবাই এখন কোনো না কোনোভাবে ভারতবিরোধী অবস্থানে। বাংলাদেশও সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তাহলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান কী হবে? তারা কিভাবে চীনের প্রভাব থেকে নিজেকে রা করবে? আমেরিকার চাপ কিংবা পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান মোকাবেলা করবে কীভাবে?

আমাদের ওপর যদি অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে আমরাও তো বাধ্য হবো কোনো না কোনো শক্তির সাথে লাইনআপ করতে। তখন ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। আমরা সে অবস্থায় যেতে চাই না। কিন্তু ভারতকে বুঝতে হবে-বাংলাদেশ আর কোনো ডিক্টেশনে চলবে না।

আমি এখানে একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ দিতে চাই। মোরারজি দেশাই যদি মুসলমান হতেন, আমি তাঁকে একজন বুজুর্গ মানুষ বলতাম। তার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। বাংলাদেশের যেকোনো সঙ্কটে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তখন খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন- কিভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলা করা যায়। প্রায় চার হাজার টন খাদ্যশস্যের জরুরি প্রয়োজন ছিল। আমি মোরারজি দেশাই ও প্রেসিডেন্ট জিয়ার মধ্যে বিদেশে দু’টি বৈঠকের ব্যবস্থা করি। সেখানে আমরা তাকে জানাই, কাদের সিদ্দিকী ও আওয়ামী লীগের কিছু লোক শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর কলকাতায় গিয়ে সশস্ত্রভাবে ময়মনসিংহ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আমরা বলি এটি বন্ধ না হলে আমাদেরও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে।

মোরারজি দেশাই তখন বলেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না, তবে সিডনিতে পরবর্তী বৈঠকে তিনি এর জবাব দেবেন। পরে সিডনির একটি হোটেলে প্রেসিডেন্ট জিয়া ও আমি তার সাথে বৈঠক করি। অনেক সময় রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে একান্ত আলাপ হতো, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও উপস্থিত থাকতেন না। সেই বৈঠকে মোরারজি দেশাই জানান- ভারত থেকে পরিচালিত ওই সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে।

খাদ্য সঙ্কটের সময় প্রেসিডেন্ট জিয়ার অনুরোধে আমি মোরারজি দেশাইকে ফোন করে দু’টি প্রস্তাব দিই- এক, ডেফার্ড পেমেন্টে বাংলাদেশকে দুই লাখ টন খাদ্যশস্য দেয়া হোক; অথবা আমরা খাদ্যশস্য কিনে পরে তা রিপ্লেস করে দেবো। তখন তিনি ত্রিপুরায় অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, তিন-চার দিনের মধ্যেই খাদ্যশস্য বেনাপোলে পৌঁছে যাবে, পেমেন্ট ব্যবস্থা পরে ঠিক করা হবে। আগে মানুষের জীবন বাঁচানো জরুরি। এই ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই আমরা এত দ্রুত সমাধান পেয়েছিলাম।

একইভাবে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর সাথে প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটি গলফ খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল স্কটল্যান্ডের গ্লিনইগলসে। সেখানে শুধু আমি উপস্থিত ছিলাম। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরেই ট্রুডোকে বাংলাদেশে ২ লাখ টন খাদ্যশস্য সহায়তার অনুরোধ জানাই। তিনি উত্তরে জানান- কোনো অর্থ লাগবে না, শুধু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির কারণেই তখন বাংলাদেশ বাস্তব সুবিধা পেয়েছিল।

পরবর্তীকালে বাংলাদেশে আর সে মানের পররাষ্ট্রনীতি বজায় থাকেনি। অদ ও অকর্মণ্য লোকদের হাতে পররাষ্ট্রনীতি চলে যাওয়ায় দেশ কূটনৈতিকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে।

আমি নিজে যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে মিয়ানমারে গিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে ভূমিকা রেখেছি। চাকমা সমস্যার সমাধানে একাধিকবার ভারতে গিয়ে আলোচনা করেছি। শফীপুরে আনসার বাহিনীর বিদ্রোহ নিরসনেও উদ্যোগ নিয়েছি। এগুলো আমার মূল দায়িত্বের মধ্যে ছিল না। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার অনুরোধে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি এবং সফলভাবে তিনটি সমস্যার সমাধান করেছি।

আমি বিশ্বাস করি- দেশপ্রেম থাকলে আল্লাহ মানুষকে সাহায্য করেন। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না। নিয়মিত নামাজ আদায়, জিকির-আজকারের মাধ্যমেই এই সম্পর্ক অটুট থাকে। অন্য ধর্মের মানুষরাও যদি নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন, তাহলে সমাজে ভারসাম্য ও শান্তি বজায় থাকে।

নয়া দিগন্ত : সীমান্তে ভারতের সাথে উত্তেজনা ও হত্যাকাণ্ড- এগুলো কিভাবে সমাধান সম্ভব?

অলি আহমেদ : সীমান্তে মানুষ মারা যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। শুধু প্রতিবাদ নোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যৌথ প্রোটোকল কার্যকর করতে হবে, নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক প্রয়োজন এবং সীমান্তরীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তে চোরাচালান, মাদক পাচার ও মানবপাচারের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকলে কোনো নিরাপত্তা উদ্যোগই সফল হয় না। প্রথমে ভেতরের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সীমান্ত কেবল একটি কাগুজে লাইন হয়েই থাকবে।

নয়া দিগন্ত : আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য- চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিভাবে নিজের স্বার্থ রা করবে?

অলি আহমেদ : বাংলাদেশকে কারো উপনিবেশ বা প্রভাববলয়ে পরিণত হতে দেয়া যাবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মমর্যাদাশীল ও স্বার্থকেন্দ্রিক। চীন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করছে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, ভারত আমাদের প্রতিবেশী তিন পরে সাথেই সম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু কোনো পরে গোলাম হওয়া যাবে না। দুর্বল নেতৃত্ব থাকলে বিদেশী শক্তি সুযোগ নেয়। শক্ত নেতৃত্ব থাকলে সবাই সম্মান করে। আমাদের কূটনীতিকদের দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও সাহস থাকতে হবে।

নয়া দিগন্ত : বর্তমান তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

অলি আহমেদ : তরুণরা এখন অনেক বেশি সচেতন, কিন্তু আবেগপ্রবণও। তাদেরকে ইতিহাস জানতে হবে, ষড়যন্ত্র বুঝতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। রাজনীতি মানে শুধু স্লোগান নয়- নীতি, ত্যাগ ও দায়িত্ব। তরুণদের উচিত দতা অর্জন, প্রযুক্তি শিা, উদ্যোক্তা হওয়া এবং রাষ্ট্র গঠনে অংশ নেয়া। শুধু রাস্তায় নামলেই পরিবর্তন আসে না- নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে হবে।

নয়া দিগন্ত : সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

অলি আহমেদ : সেনাবাহিনী জাতির গর্ব। তাদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। কোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হলে বাহিনীর সম্মান ক্ষুণœ হয়। একইভাবে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের মনে রাখতে হবে- মতা চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস সবাইকে বিচার করে।

নয়া দিগন্ত : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে আপনি কোন পথে দেখতে চান?

অলি আহমেদ : আমি চাই একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। যেখানে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাবে, শ্রমিক নিরাপত্তা পাবে, তরুণরা কাজ পাবে, নারীরা সম্মান পাবে, বিচার হবে দ্রুত ও নিরপে। বিদেশে মাথা নত করে নয়- নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালিত হবে। এই ল্য অর্জনে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব আছে।

ড. অলি আহমেদের বক্তব্যে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক নিরপেতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আঞ্চলিক কূটনীতি ও নৈতিক রাজনীতির প্রশ্ন একসাথে উঠে এসেছে। তিনি নির্বাচনকে শুধু মতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।