যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংসাত্মক জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
শক্তিশালী থাকতেই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে পেজেশকিয়ান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যেকোনো হুমকির জবাব ‘ধ্বংসাত্মক’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হবে ব্যাপক ও চূড়ান্ত।
ইরানি গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে আলী আবদুল্লাহ বলেন, স্থল, সমুদ্র, আকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা ও সাইবার ক্ষেত্রে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী শত্রুর নতুন হুমকির জবাব দেবে যা হবে চূর্ণকারী, শাস্তিমূলক ও ধ্বংসাত্মক। এ ছাড়া ইরানের প্রভাবশালী পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও বলেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাতে ইরানকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচকও তিনি। ইরাক সফরের সময় গালিবাফ বলেন, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে আমরা তা অতিক্রম করতে পারি।
এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এরপরেই শুক্রবার তেহরানের পক্ষ থেকে এ সতর্কবার্তা দেয়া হলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেসব দেশ ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। পরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
শক্তিশালী থাকতেই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে পেজেশকিয়ান
যুদ্ধ অবসানের একটি উপযুক্ত সময় খুঁজছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মনে করেন, এখনই সেই ভালো সময়। কারণ, তেহরান এখন বেশ শক্তিশালী ও সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। গতকাল শুক্রবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো এই তথ্য সামনে এনেছে। মিজান নিউজ এজেন্সি ও ইসনার খবর অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান বলেছেন, শক্তি ও সম্মান থাকতে থাকতেই আজ যুদ্ধ থামানো সবচেয়ে ভালো। প্রেসিডেন্ট যখন সংঘাত শেষের কথা বলছেন, তখন ইরানের সামরিক বাহিনীর কথায় কিছুটা ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। মেহের নিউজ এজেন্সির মতে, সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, নতুন কোনো হুমকি এলে বড় ধরনের জবাব দেয়া হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি তেহরানের সাথে আলোচনা আপাতত বন্ধ রেখেছেন। এর পরপরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের কথা জানায়। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, তারা জানিয়েছে, যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, তবে তারা আরো বড় ও শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
অর্থনৈতিক হুমকি সমাধান নয় : চীন
ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ হুমকির প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং জানিয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা চাপ প্রয়োগ কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, তারা বিশ্বাস করেন যে, নিষেধাজ্ঞা কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এর বদলে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যারা তেহরানের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সরাসরি বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি মেনে চলার আহ্বান জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই দ্বন্দ্বে চীন বেশ সতর্ক কূটনীতি বজায় রেখে চলেছে। উভয় পক্ষের সাথেই তারা যোগাযোগ রাখছে। অর্থনৈতিকভাবে তেহরানের বড় ভরসা হলেও, চীনের ওপর নতুন করে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই।
ঝুঁকিতে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদাররা
ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি চীনের সাথে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান চীন থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। আর চীনে রফতানি করে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। তেহরান থেকে বেইজিংয়ে রফতানির বড় অংশ ছিল হাইড্রোকার্বন ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অ্যালকোহল এবং প্লাস্টিকের মতো রাসায়নিক পণ্য।
এর বিনিময়ে ইরান চীন থেকে শিল্পযন্ত্র, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, গাড়ি ও ধাতু আমদানি করে। চলতি সপ্তাহে ইরানের সাথে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণা দেয়ার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। ইরানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারির আগের ১০ মাসে ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। একই সময়ে আমিরাত থেকে ইরানে আমদানি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই সময়ে চীন থেকে আমদানির চেয়েও এ পরিমাণ বেশি। ইরানের আরেকটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার তুরস্ক। ইরানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে তুরস্ক থেকে ইরান ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। অন্য দিকে ইরান থেকে তুরস্কে প্রায় ৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে হাইড্রোকার্বনজাত পণ্যই ছিল প্রধান। ইরানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে ইরান থেকে রাশিয়ার আমদানির পরিমাণ ছিল ৯৩০ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রাশিয়া থেকে ইরানে রফতানি হয়েছে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০২২ সালে রাশিয়া শস্য, সোনা ও কাঠের বিনিময়ে ইরানের কৃষিপণ্য নিয়েছে। দুই দেশের সহযোগিতাও আরো বেড়েছে। দ্য টেলিগ্রাফের এক খবরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য কাস্পিয়ান সাগরে নতুন একটি নৌপথ চালুর কথা বলা হয়েছে।
জুলাইয়ে ইউক্রেন কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। এতে তেহরান ক্ষুব্ধ হয়। ২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে ইরানে থেকে ইরাকে রফতানির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইরাক থেকে ইরানে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ভারতের বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের পর জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে ভারত। সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি ভারত ইরান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান দফতর ডেস্টাটিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইরানে জার্মানির রফতানির পরিমাণ ছিল ৮৭০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে জার্মানি ইরান থেকে ২১৭ মিলিয়ন ইউরোর পণ্য আমদানি করেছে।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে দেশটির রফতানি বেড়ে ৬৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। আগের বছর তা ছিল ৪৩ মিলিয়ন ডলার। ইরানের তেল রফতানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে সরকারি হিসাবে আমদানি শূন্য। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে জাপানের রফতানি ৩৮ শতাংশ বেড়ে ৮৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ২৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল ওষুধ, গাড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। আমদানির মধ্যে ছিল কাপড়জাত পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী।
২০২৪ সালে ফিলিপাইন ইরানে ৬৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ৩৮ মিলিয়ন ডলার। দেশটির পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ইরান থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের কম।