কূটনীতি ও প্রতিরক্ষার যৌথ কৌশলে ইরান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ, নৌ-বাধা এবং মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ পদক্ষেপের মুখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ভূখণ্ড রক্ষায় শক্ত অবস্থানে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান সরকার। একই সাথে দেশটির শীর্ষ নেতারা স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও টানা নিষেধাজ্ঞার ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরান সরকার জানিয়েছে, বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাত দু’টি একে অপরের ‘পরিপূরক, সমন্বিত ও অবিচ্ছেদ্য’ অংশ হিসেবে কাজ করবে। সরকার উভয় পথেই একযোগে এগোবে। ইরানের মূল লক্ষ্য থাকবে মূল্যস্ফীতি কমানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় উৎপাদনে সহায়তা দেয়া এবং ধীরে ধীরে লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা। এর আগে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন করে উসকানি না দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ইসরাইলের আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং আমেরিকার উসকানি পরিহার করা পুরো অঞ্চলের শান্তির জন্য ইতিবাচক। ইরান যুদ্ধ না চাইলেও যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেবে। তিনি মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে ইসলামি দেশগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, শীর্ষ নেতার হত্যাকাণ্ডের বিচার ও বদলা নেয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি মিসর, লেবানন, তুরস্ক, ইরাক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে তেহরান প্রাধান্য দেবে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি জানান, জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে দেশের শীর্ষ নেতার দেয়া নির্দেশনা নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও তেলের বাজার পরিস্থিতি
টানা অবরোধের কারণে ইরানে গত মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর কায়েমপনাহ জানান, মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে দেশের আমদানি-রফতানি প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ কমে গেছে এবং জ্বালানির ঘাটতি মেটাতে পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতি সামলাতে প্রেসিডেন্ট দেশে জ্বালানি তেলের (গ্যাসোলিন) তৃতীয় স্তরের কোটা প্রতি লিটারে ৫ হাজার তোমান থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার তোমান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন, শীতকালে শিল্প উৎপাদন বজায় রাখতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ ব্যাহত হতে দেয়া হবে না এবং বিধিনিষেধ দরকার হলে তা সাধারণ মানুষের আগে সরকারি দফতরে প্রয়োগ করা হবে।
অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও চলতি ফার্সি বছরের প্রথম চার মাসে অর্জিত সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হস্তান্তর করেছে ইরান, যা দিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় মেটানো যাবে। বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বর্তমানে ৯৯ শতাংশ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া গত জুনে মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারক চলাকালে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিল।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
আমেরিকার নতুন পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ওয়াশিংটন অন্য দেশগুলোকে ইরানের সাথে বাণিজ্য ছিন্ন করার তাগিদ দিলেও, মার্কিন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় চীন বা ভারতের মতো প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর সরাসরি বড় নিষেধাজ্ঞা দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। তবে তেহরানের সাথে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে মিসরের ‘ব্যাংক মিসর’-এর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা ব্যাংকটির শাখার ডলার লেনদেন বন্ধ করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক মিসর জানিয়েছে, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং সাধারণ গ্রাহকদের অন্যান্য পরিষেবা স্বাভাবিক রয়েছে। এ ছাড়া হংকং-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের ‘ব্যাংক মেল্লি’র সাথে জড়িত এক ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ও সামরিক প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন এবং তার পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হন। সম্প্রতি লিখিত বার্তায় মোজতবা খামেনি বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেন। হামলার পরপরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। পরে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে ১৪ দফার একটি ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও বর্তমানে তা স্থবির। কাতার সফররত প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি না মানা পর্যন্ত এই পথ পুরোপুরি খোলা হবে না। মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালীর মাইন অপসারণ ও এটি উন্মুক্ত বলে দাবি করলেও ইরানি নৌবাহিনী তা ‘স্পষ্ট মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করতে পারবে না। সম্প্রতি এ পথে জাহাজ চলাচল অস্বাভাবিক কমে গেছে। অন্য দিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিওট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা চীন ও রাশিয়াকে সামলানোর ক্ষেত্রে তাদের সামরিক কৌশলকে পুনর্গঠনে বাধ্য করছে। তবে হোয়াইট হাউজ ও পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অস্ত্র সঙ্কটের কথা অস্বীকার করেছে।