সাক্ষাৎকার : আন্দালিব রহমান পার্থ
এখন নির্বাচনমুখী হওয়া উচিত আমাদের
Printed Edition
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইতিবাচক। বিএনপির সাথে বৈঠক এবং লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার বৈঠকের পর ‘এভরিথিং ইজ পজিটিভ,’ আলহামদুলিল্লাহ। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে সময়ের ধাপে ধাপে ভালো জনপ্রতিনিধি সংসদে আসবে। গত এক-দেড় দশকে কারা রাজনীতিতে এসেছে বা সংসদে গিয়েছে তো সবাই দেখেছে, সবাই জানে। নায়ক-নায়িকা বা কোন ধরনের মানুষ সংসদে গিয়েছে, আমি কাউকে হেয় করছি না কিন্তু সংসদে বসার যোগ্যতা কতজনের ছিল, সংসদে কিভাবে কথা বলা হতো, কিভাবে অ্যাটাক করা হতো, কিভাবে তোষামোদ করা হতো, এই পরিবেশটা তো গত ১৭ বছর মানুষ দেখেছে।
পার্থ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামীতে ভালো ভালো পার্লামেন্টেরিয়ান আসবে, সংসদে যারা মানুষের অধিকারের কথা বলবে। কিন্তু এ জন্য সময় দিতে হবে। সতেরটা বছর একটা অব্যবস্থাপনা, অস্থিরতা আর অনির্বাচিত সরকারের রেজিম যেটা এটা থেকে বের হওয়ার পর মানুষকে একটা ব্রেদিং স্পেস দিতে হবে। রাতারাতি বাংলাদেশ আবার ঠিক হয়ে যাবে আমি বলব না, তবে একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।
নয়া দিগন্ত : তা হলে রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচন প্রস্তুতির মুখে কি বলেন?
আন্দালিব রহমান পার্থ : রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেতরে নির্বাচন প্রস্তুতির কাজ আরম্ভ করে দিয়েছে। আমরাও আমাদের মতো করে গোছাচ্ছি। সাংগঠনিকভাবে যোগাযোগ হচ্ছে, ভালোই সাড়া পাচ্ছি। তবে নির্বাচন কেমন হবে এটা পুরোপুরি অনুভব করা খুব আর্লি হয়ে যায়। অনেক দিন মানুষ ভোট দিতে পারেনি, এবার ভোট দিতে চাবে। কিন্তু আগামীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হয়, স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি কেমন থাকে, এসব কিছুর ওপর নির্ভর করে আমরা মানুষকে কতটা আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারব। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা কেমন হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ কতটা সামাল দিতে পারবে এগুলোর ওপর নির্ভর করছে। এখনো নির্বাচনী ডামাডোল ওইভাবে বাজেনি, যেহেতু সবাই ধারণা করছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে, আমার ধারণা অক্টোবর নভেম্বর থেকে নির্বাচনী আমেজটা আসতে শুরু করবে। মানুষের মধ্যে একটা অ্যাটমোসফেয়ার চলে আসবে। এখনো মানুষ দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচনের আগে তা হলে এখন কি কি ধরনের কাজ বা সংস্কার করে ফেলা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আন্দালিব রহমান পার্থ : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ বেশি চিন্তিত হয়। যেহেতু ভোটের সময় গণ্ডগোলের একটা প্রবণতা থাকে। বিশেষ করে অনেক বছর ধরে অজপাড়াগাঁয়ে, গ্রামাঞ্চলে, দূর-দূরান্তে যেসব সেন্টারগুলোতে একটা পেশিশক্তির ব্যবহার থাকে, আবার দেখা যায় প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও অনেক দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় বড় রাজনৈতিকদলগুলো একদমই গ্রাহ্য না করার একটা প্রবণতা থাকে, তো এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা আসলে সময়ের ব্যাপার, নির্বাচনকে ঘিরে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ নিয়ে আসতে পারলে এসব বাধা দূর করা সহজ হয়। অবশ্য এবার নির্বাচনে এ ধরনের বাধা একটু কম হবে, আওয়ামী লীগের সময় ব্যাপারটা আলাদা ছিল, অনেক দিন ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের সাথে আমাদের সম্পর্ক অনেকটা দা-কুমড়া সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। এখন যারা ক্ষমতায় যাবে, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিপরীত মতপার্থক্য আছে কিন্তু শত্রুতা বা ওই ধরনের কোনো একটা অ্যাটমোসফেয়ার ক্রিয়েট করে না। সুতরাং ওই দিক থেকে আমি শিওর ভোটাররা অনেক স্বস্তিতে থাকবে।
নয়া দিগন্ত : ভোটার, রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল মিলে সবার মধ্যে একটা পরিবর্তনের উপলব্ধি কাজ করছে।
আন্দালিব রহমান পার্থ : অবশ্যই আমাদের মধ্যে দ্বিমত আছে, অনেক রাজনৈতিক দলের সাথে আমরা ময়দানে থাকব, অনেকের বিরুদ্ধে আমরা নির্বাচন করব, তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিন্তু তাদের আমরা শত্রু মনে করি না। আওয়ামী লীগের সময় দলটির একলা চল নীতি, স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিজমের যে একটা নমুনা ছিল, মনে হতো আইদার আপনি আওয়ামী লীগ না হয় আপনি আওয়ামী লীগের এনিমি, ন্যাচার্যালি এই জিনিসটা ভোটারদের মধ্যে ভীতির কাজ করত। ভোটটা দিলে আমি আওয়ামী লীগের শত্রু হয়ে যাব, আওয়ামী লীগ সরকারে আছে, এই করবে, সেই করবে, ওই জিনিসটা তো আর নেই। এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, ভিন্ন দল আছে, ভিন্ন মত আছে, রাজনৈতিক মাঠে সব দলই বসবে, নির্বাচন করবে, মতবিরোধ থাকতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগ যে তিনবারে নির্বাচনী কালচারটা নষ্ট করে দিয়েছিল এটা ঠিক করতেও সময় দিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিকদলগুলো ভোটারদের কাছে কি বা কোন কোন ইস্যু নিয়ে যাবে?
আন্দালিব রহমান পার্থ : প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নিজস্ব ক্যাম্পিং থাকবে, এখনই এটা বলা টু আর্লি, আরো দেখার ব্যাপার আছে, নির্বাচনে কি কি সংস্কার আসবে সেগুলো তো আমরা জানি না। নির্বাচন কমিশনের, আরপিও’র কি কি সংশোধনী আসে, নির্বাচনে দলগুলো কি করে আসে, ক্যাম্পেইনের প্রসিডিউর কি কি চেঞ্জ হয়, পোস্টার থাকবে কি না, অনেকে বলে বড় জনসভা হবে না, অল্টারনেট কি থাকবে, অনেক কিছু শুনছি কিন্তু জানি না আমরা। নির্বাচনের আগেই এগুলো বলতে হবে, আরপিওতে কি কি সংশোধনী থাকছে, ক্ষমতার মেয়াদ কত বছরের হবে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অন্য দলের মার্কা নিতে পারবে কি না, কোনো দল জোট করলে কোনো মার্কা হবে নাকি, কি মার্কায় দাঁড়াবে, কে কত সিটে দাঁড়াতে পারবে, নির্বাচনী প্রচারে নতুন কি হবে, সবই তো উড়াউড়া শুনছি।
নয়া দিগন্ত : তার মানে সংস্কারে আরো গতি আসা প্রয়োজন।
আন্দালিব রহমান পার্থ : সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব না। আর নির্বাচনই সবচেয়ে বড় সংস্কার। আমাদের এখন নির্বাচনমুখী হওয়া উচিত। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার হবে এবং জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা থাকবে।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়....
আন্দালিব রহমান পার্থ : আমি মনে করি না কালো টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায়। টাকার একটা প্রভাব হয়তো থাকে। তবে টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায় তা বাস্তব মনে করি না।
নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি জিওপলিটিক্যাল গ্রাউন্ড রিয়েলিটি নিয়ে অনেকে বলছেন...
আন্দালিব রহমান পার্থ : দেখুন ইউনূস সাহেবের একটা পলিসি হবে, আগামী নির্বাচিত সরকারের একটা পলিসি হবে, অন্তর্বর্তী সরকার পার্মানেন্ট সরকার নয়, আমি শিওর নির্বাচিত একটি ডেমোক্র্যাটিক সরকারের সাথে আগামীতে অনেক ভালো সম্পর্ক হবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের। প্রত্যেকটা দেশের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।
নয়া দিগন্ত : ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ, পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হলে তা ফের আমাদের রাজনীতি বা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি?
আন্দালিব রহমান পার্থ : সারা বিশ্বেই এ যুদ্ধের প্রভাব পড়বে। তেলের দাম বাড়বে। আমদানিতে অসুবিধা হবে, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। নির্বাচনে হয়তো প্রভাব বিস্তার করবে না, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে। ইকোনমি আর পলিটিক্স তো একটার সাথে আরেকটা জড়িত, একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা করতে পারবে না।