বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্র চীনের ভূরাজনীতি

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূরাজনীতি চলছে। ভারত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রুটিন সম্পর্কের বাইরে কোনো কিছুতে জড়াতে চায় না। প্রতিবেশী দেশটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার মন:পুত না হলে তারা আবারো অংশগ্রহণমূলক বা অন্তর্ভুক্তির ইস্যুটি তুলবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। ভারতকে বাদ রাখলে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অন্যান্য দেশকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কখনো অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কার করে বলেছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই সরকারের আমলে হওয়া বাণিজ্যিক সমঝোতাসহ অন্যান্য ইস্যুর ধারাবাহিকতা তারা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের আমলেও চায়। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিসহ কূটনীতিকরা সরাসরি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলেছেন।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভালো সম্পর্কের সুবাদে বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে চীনের আধিপত্য ছিল। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সাথেও চীনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের সাথেও যাতে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, সেজন্য বাংলাদেশের সব বড় রাজনৈতিক দলের সাথে চীন ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছে।

এ দিকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলা প্রতিযোগিতা এখন প্রকাশ্যে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজের সময়ে চীনের সাথে কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার ঝুঁকির বিষয়টি আমি তুলে ধরব। আমি আশা করব, এগুলো বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, অংশীদার দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর চাহিদা মেটানোর উপায় আমাদের জানা আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই চাহিদা মেটাতে না পারলে আমাদের মিত্র দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এ মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র বলেছেন, চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা দুই দেশ ও তাদের জনগণের বিষয়। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কিংবা আঙুল তোলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার পক্ষে সহায়ক এমন কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দেয়ার তাগিদ দিতে চাই।

প্রসঙ্গত, বহু বছর ধরে বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের অন্যতম প্রধান জোগানদাতা চীন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সাথে বিরোধ সৃষ্টি এবং চীনের সাথে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠতাকে বিবেচনায় নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে বাংলাদেশ সমরাস্ত্রের উৎস বিস্তৃত করার দিকে মনোযোগ দেয়। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি তুরষ্ক থেকেও সমরাস্ত্র কেনে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি চীনের সহায়তায় পাকিস্তানে নির্মিত যুদ্ধবিমান কেনার জন্যও আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ইটালির কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি এবং নেদারল্যান্ডসের সাথে নৌ-প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যার আওতায় ডাচ কোম্পানির মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও সরবরাহের পথ সুগম হবে।

যুক্তরাষ্ট্রও বেশ আগে থেকেই সমরাস্ত্র কেনার জন্য বাংলাদেশকে তাগাদা দিয়ে আসছে। কিন্তু তা অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশ ‘ধীরে চল’ নীতি নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত দু’টি সামরিক চুক্তিও বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের বিবেচনাধীন রয়েছে।

অন্য দিকে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে তার দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়া এবং সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করার কথা বলেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারতের কাছ থেকে ফেরত চেয়েছিল বাংলাদেশ। এ ছাড়া ভারতে অবস্থান নিয়ে কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে যাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জড়াতে না পারে, সেজন্য বারবার তাগাদা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এতে কোনো কাজ তো হয়ইনি, উল্টো শেখ হাসিনা গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে অবস্থিত ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (দিল্লিতে কর্মরত বিদেশী সাংবাদিকদের সংগঠন) সংবাদ সম্মেলন করে অডিও বার্তা দিয়েছেন। আর এই সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে শেখ হাসিনাকে সাবেক নয়, বরং ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা পাঁচ দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভুত্থানের পর থেকে সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতের সাথে চলা সম্পর্কের টানাপড়েন আরো তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসব ব্যাপারে নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অবস্থানগত পার্থক্য রয়েছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে চায় না। এই মনোভাব ভারত সরকার কয়েকবার বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধি দল ছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা একটি নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সাথে ভারত বলেছিল, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনটি তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক দেখতে চায়। মুখে কোনো দলের নাম না বললেও এটা কোন দিকে ইঙ্গিত করে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এখন ইঙ্গিত করা দলটিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও ভারত নানাভাবে কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দল বা জোট বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পরও যদি তা ভারতের মনঃপুত না হয়, তখন তারা বলতে পারে যে নির্বাচনটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না।

ভারতকে বাদ রাখলে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অন্যান্য দেশের সরকার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কখনো অস্বস্তি প্রকাশ করেনি বলে জানান রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান।