সংসদে প্রধানমন্ত্রী

ফ্যাসিস্ট আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে

Printed Edition
first-1
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল জাতীয় সংসদের মুলতবি অধিবেশনের শুরুতে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন : পিআইডি

সংসদ প্রতিবেদক

  • গন্তব্য দেশ ১০টি, তিনটির সাথে চুক্তি, ৭টির সাথে প্রক্রিয়াধীন
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে
  • ৪ বছরে ৪ কোটি পরিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে; তুলে ধরলেন সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা

দুর্নীতি, অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার- এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মোট প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের এই তথ্যকে তিনি দেশের অর্থনীতির জন্য ‘গুরুতর চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

১১টি অগ্রাধিকার মামলা : পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার ইতোমধ্যে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- ১. সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; ২. সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী সংশ্লিষ্ট পক্ষ; ৩. এস আলম গ্রুপ; ৪. বেক্সিমকো গ্রুপ; ৫. সিকদার গ্রুপ; ৬. বসুন্ধরা গ্রুপ; ৭. নাসা গ্রুপ; ৮. ওরিয়ন গ্রুপ; ৯. নাবিল গ্রুপ; ১০. এইচবিএম ইকবাল ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ১১. সামিট গ্রুপ।

প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব মামলায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চুক্তি : অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চীন।

এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) সই হয়েছে। বাকি সাতটি দেশের সাথে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

টাস্কফোর্স ও তদন্ত কাঠামো : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স বিভাগ যৌথভাবে তদন্ত পরিচালনা করছে।

এ লক্ষ্যে ১১টি যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে, যারা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতি তদারকি করছে।

সম্পদ জব্দের অগ্রগতি : ২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট জব্দ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে এখন পর্যন্ত ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিতে চার্জশিট এবং ৬টি মামলায় রায় হয়েছে।

আইনের শাসনের অঙ্গীকার : সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থপাচারের সাথে জড়িতদের তালিকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রস্তুত করছে। তিনি অতীতের স্বেচ্ছাচারিতার সমালোচনা করে বলেন, ‘বর্তমান সরকার আইনকে সম্মান করে। জোরজবরদস্তি নয়, বরং প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। যারা জনগণের অর্থ পাচার করেছে বা আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা : সামাজিক নিরাপত্তা ও সংস্কার : একই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী সরকারের চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন- সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তার; অর্থপাচার রোধ; নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগামী চার বছরে ৪ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

তিনি জানান, এই কর্মসূচির মূল দর্শন- ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে কার্ড দেয়ার মাধ্যমে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে।

ইতোমধ্যে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প চালু হয়েছে, যেখানে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রী আরো জানান- কৃষিঋণ মওকুফ : শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ; খাল খনন: ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন; বৃক্ষরোপণ: ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা; শিক্ষা: ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম; প্রযুক্তি: ৪১৮ প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং ক্রীড়া : ৫০০ ক্রীড়াবিদের জন্য ভাতা কর্মসূচি।

এ ছাড়া ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী প্রদান, প্রযুক্তি খাতে পেপ্যাল চালু এবং আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট- অর্থপাচার দমন ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে সরকার এক দিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করছে, অন্য দিকে দেশীয় আইনিকাঠামো শক্তিশালী করে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। একই সাথে সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সমন্বিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।