সীমানা পুনর্নির্ধারণে আসামে ১৫ আসনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ্রাস

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভোটের আগে ভারতের আসামে নির্বাচনী এলাকাগুলোর সীমানা এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমে যায়। আসামের ১২৬টি আসনের মধ্যে প্রায় ৩৫টিতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এখন তা কমে প্রায় ২০টি আসনে দাঁড়িয়েছে। আসামে ভোটগ্রহণ হবে ৯ এপ্রিল।

২০২৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি আদেশের ফলে আসামের সংসদীয় ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনী এলাকাগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে উত্তরে প্রাচীন বোরাইল পাহাড় এবং দক্ষিণে বরাক নদী বেষ্টিত বাংলাদেশের সিলেট সীমান্ত সংলগ্ন সংকাটিগোরা নির্বাচনী এলাকার সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এই নির্বাচনী এলাকার জনসংখ্যা আগে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত ছিল। আসাম রাজ্যের প্রধান দলগুলোর মধ্যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি যারা আসাম রাজ্যও শাসন করে একজন হিন্দু প্রার্থীকে বেছে নিত। বিরোধী দল কংগ্রেস প্রায়ই একজন মুসলিম প্রার্থীকে বেছে নিত, যেমনটা করত রাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, যাদের মূল ভোটারদের মধ্যে বাংলাভাষী মুসলিমরাও রয়েছেন।

এখন সেই ভারসাম্য পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে কাটিগোরায় প্রায় এক লাখ ৭৪ হাজার ভোটার ছিল। আলজাজিরাকে কংগ্রেস দলের কাটিগড়ার সাবেক বিধায়ক খলিল উদ্দিন মজুমদার বলেন, পাশের বিধানসভা কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪০ হাজার হিন্দু ভোটারকে এখন কাটিগড়ার সাথে একীভূত করা হয়েছে, ফলে এটি একটি প্রধানত হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, এখান থেকে একজন মুসলিম প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে, প্রধান দলগুলো কাটিগরার জন্য হিন্দু প্রার্থী বেছে নিয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনী এলাকাটি একা নয়। রাজ্যের ১২৬টি বিধানসভা কেন্দ্রজুড়ে সীমানা এমনভাবে নতুন করে আঁকা হয়েছে, যা মুসলিম ভোটারদের মনে আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে যে, আসামের এক কোটি ১০ লাখ মুসলিমকে রাজনৈতিকভাবে আরো প্রান্তিক করে তুলতে পারে। এটি এমন এক সময়ে করা হলো যখন শাসক দল বিজেপি উচ্ছেদ অভিযান, বিতাড়ন নীতি এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

আসামের জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশেরও বেশি মুসলিম। কেবল জম্মু ও কাশ্মির এবং লাক্ষাদ্বীপে মুসলিমদের অনুপাত এর চেয়ে বেশি এবং আসামের মতো এগুলোর কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছে, আসাম হলো বিজেপির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নীতির সর্বশেষ পরীক্ষাগার। এই রাজ্যে যা কার্যকর হচ্ছে, তা ভারতের বাকি অংশের জন্য একটি আদর্শ মডেল হয়ে উঠতে পারে।

‘সাম্প্রদায়িক জেরিমান্ডারিং’

বিশিষ্ট নির্বাচনী বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় লিখেছেন যে আসামের সীমানা নির্ধারণ মডেল কার্যত ‘সাম্প্রদায়িক জেরিমান্ডারিং’। তিনি এটিকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণভিত্তিক জেরিমান্ডারিংয়ের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বা প্রান্তিক গোষ্ঠীর নির্বাচনী প্রভাব কমাতে নির্বাচনী সীমানায় কারসাজি করা হতো বা নতুন করে নির্বাচনী এলাকা ভাগ করা হতো।

যাদব যুক্তি দিয়েছেন যে, আসামের প্রেক্ষাপটে, জেরিমান্ডারিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধার করা কৌশল ক্র্যাকিং, প্যাকিং এবং স্ট্যাকিংয়ের ব্যবহার করে মুসলিমদের নির্বাচনী প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। ‘ক্র্যাকিং’ বলতে বোঝায় একাধিক হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী এলাকায় মুসলিম ভোটারদের বিভক্ত করে দেয়া, যার ফলে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা কমে যায়। ‘প্যাকিং’-এর ক্ষেত্রে, একাধিক মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা যেগুলো বেশ কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারত সেগুলোকে একটি একক আসনে একত্রিত করা হয়, যাতে মুসলিম প্রার্থীদের জেতার মতো নির্বাচনী এলাকার সংখ্যা কমে যায়।

একই সাথে, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে, যেগুলো প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম ছিল না, সেগুলোকে একটি একক নির্বাচনী এলাকার অধীনে একীভূত করা হয়েছিল যাতে সম্প্রদায়টি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। যাদব একেই ‘স্ট্যাকিং’ বলে বর্ণনা করেছেন।

আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) রাজ্য সম্পাদক সুপ্রকাশ তালুকদার বলেন : ‘দূরবর্তী মুসলিম-অধ্যুষিত আসনগুলোর হিন্দু এলাকাগুলোকে মিশ্র জনসংখ্যার নির্বাচনী এলাকায় একীভূত করা হয়েছিল, অন্য দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলোর মুসলমানদের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘মুসলিম প্রতিনিধিত্বের পঙ্গুত্ব’

বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতে, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলার বিধানসভা কেন্দ্রগুলো এই উদাহরণ হিসেবে কাজ করে যে, কীভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া আসামের ভূদৃশ্যকে নতুন রূপ দিয়েছে। ১৭ লাখেরও বেশি বাংলাভাষী মুসলিমের আবাসস্থল বরাক উপত্যকায়, সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা ১৫ থেকে কমে ১৩ হয়েছে।

বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক গবেষক আহমেদ তহিদুস জামান আলজাজিরাকে বলেন, ২০২৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে, এই অঞ্চলের তিনটি আসন আলগাপুর, হাইলাকান্দি এবং কাটলিছেড়া মূলত কংগ্রেস পার্টি বা এআইইউডিএফের মুসলিম প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু এখন আলগাপুর ও কাটলিছেড়া থেকে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো কেটে হাইলাকান্দির সাথে জুড়ে দিয়ে সেটিকে একটি হিন্দু আসনে পরিণত করা হয়েছে। রাজ্য বিধানসভার নওবোইচা আসন থেকে এর আগে তিনবার মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আসন পুনর্নির্ধারণের ফলে এর মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ‘পাশের চারটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে’, ২০২১ সালে এআইইউডিএফের টিকিটে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আজিজুর রহমান আলজাজিরাকে এ কথা জানান।

ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে ঐতিহ্যগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত জাতি ও উপজাতিদের সদস্যদের জন্য বেশ কয়েকটি আসন সংরক্ষিত থাকে। রহমান এখন উত্তর আসামের একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা [বিজেপি] মুসলিম প্রতিনিধিত্বকে পঙ্গু করে দিয়েছে, একটি জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে রহমান এ কথা বলেন।

সীমানা পুনর্নির্ধারণে কারচুপির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চেয়ে আলজাজিরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে একটি বিস্তারিত প্রশ্নমালা পাঠিয়েছে, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি।

‘মিয়াদের চেষ্টা করে লাভ নেই’

বরপেটা নির্বাচনী এলাকার মুসলিম ভোটার নবাব মেজবাহুল আলম বলেন, বিজেপি মুসলিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা গোপনও করছে না। তিনি আসাম মন্ত্রিসভার মন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বরুয়ার সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেন। বরপেটায় প্রচার চালানোর সময় বরুয়া বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী এলাকাটি এমনভাবে সীমানা নির্ধারণ করেছি যে এবার মিয়াদের [বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য একটি অপমানজনক গালি] জেতার চেষ্টা করে লাভ নেই।’

বরপেটা বিধানসভা আসন থেকে এর আগে চারবার মুসলিমরা নির্বাচিত হয়েছেন। এখন নতুন সীমানা নির্ধারণের পর এটি একটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী এলাকা, যা একজন হিন্দু নিম্নবর্ণের প্রার্থীর জন্য সংরক্ষিত। বরপেটা কিভাবে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে পরিণত হলো তা ব্যাখ্যা করে বরপেটার প্রাক্তন বিধায়ক আবদুর রহিম আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী এলাকাগুলো থেকে হিন্দু ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘বরপেটায় মুসলিম ভোটাররা এখন তাদের কণ্ঠ হারিয়েছেন,’ আইনজীবী আলম বলেন। ‘এখন কোনো মুসলিম আমাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না।’