গণভোট প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক

‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আমরা রাজনৈতিক দলের কাছে সুস্পষ্ট আহ্বান জানাই- কোনো রকম অস্পষ্ট না রেখে তারা যেন সুস্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে অঙ্গীকার করেন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য কতগুলো কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। আপনারা জেনে-বুঝে হ্যাঁ কিংবা ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নেবেন। এই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়া মানে সংস্কার হওয়া, ‘না’ জয়যুক্ত হওয়া মানে সংস্কার না হওয়া। এই সংস্কার না হলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি। এ অবস্থায় আগামীতে যে সরকার নির্বাচিত হয়ে আসবে, তাদেরও স্বৈরাচারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা-সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপের আয়োজন করে সুজন।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। আমরা তাদেরকে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ব্যাপারে তাদের অবস্থান ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’- এটা সুস্পষ্ট করার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমরা বলেছি যে নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে। টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসতে হবে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ হবে তা নিশ্চিত করা যায় না, এর জন্য কতগুলো সংস্কার আমাদের করতে হবে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরিত ৮৪টা বিষয়ে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। তার মধ্যে ৪৮টা বিষয়ে গণভোট হবে আর ৩৬টা বিষয়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা হবে। সুতরাং এই ৪৮টা বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’-এর বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে মব জাস্টিস নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে ড. বদিউল আলম মজুমদার আক্ষেপের সাথে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, মব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং মবের অবসান হওয়া দরকার। যত দ্রুত এর অবসান হয়, ততই দেশের জন্য মঙ্গল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমার নিজের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। তখন মব ঘটিয়ে নানাভাবে আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে। দেশে আগে মব হলেও তখনকার প্রতিকূল পরিবেশে সংবাদমাধ্যম সেগুলো সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি বা গুরুত্ব দেয়নি।

বর্তমান রাজনীতি জনসেবার বদলে অর্থ উপার্জনের মুখ্য উপায়ে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সম্পদ ও আয় আকাশচুম্বীভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের আয় ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রাজনীতি এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির প্রার্থীদের সম্পদের বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত সামান্য।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা রাগীব আহসান বলেন, এই দেশকে কল্যাণমুখী করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যেখানে একজন শ্রমিক তার অধিকার পাবেন। পিছিয়ে পড়া মানুষদের টেনে এনে কিভাবে তাদের এগিয়ে নেয়া যায়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এগুলো আগামীর ইশতেহারে গুরুত্ব দিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েব আমির হেলাল উদ্দিন বলেন, আমাদের ইশতেহার তৈরি হয়েছে। আগামী ২২ জানুয়ারির পর তা প্রকাশ করা হবে। ইশতেহারে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের অঙ্গীকার আছে। সেখানে নারীদেরও অধিকারের কথা বলা আছে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা: মিজানুর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের দায়িত্ব সংস্কার করা। আর ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের কাজ ছিল তাকে সহায়তা করা। দলগুলো সরকারকে সমর্থনও করেছিল। কিন্তু মানুষ বলছে যে, সরকার গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সরকার নানানভাবে বিভ্রান্ত হয়েছে, আমাদেরও বিভ্রান্ত করেছে। সরকারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা অনেক কিছু ঠিক করেছিলাম যে বিষয়ে একমত হয়েছিলাম, সে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হবে। যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যায়নি, সেগুলো গণভোটে যাবে। কিন্তু এখন সরকার বিভ্রান্ত করছে।

গণঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, এই সরকারের এখন পর্যন্ত কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আমি জানি না কিভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে মানুষ প্রচারণা চালায়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে আগামী নির্বাচনও একটা সময় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এই সরকার যত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সব একসময় যে কেউ বাদ দিয়ে দেবে। ফলে এই সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া লাগবেই, দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে।

বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এই নির্বাচনে নারীর ভোট অর্ধেকের বেশি। দলগুলো খুব ক্রুশিয়াল মোমেন্টে নারীদের প্রয়োজন মনে করে, কিন্তু অন্য কোনো সময় নারীদের আর প্রয়োজন মনে করে না। কোনো কোনো দল বাধ্য হয়ে পুরুষ প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে পুরুষের কোটায় নারীদের মনোনয়ন দেয়। যুগে যুগে অসংখ্য ইশতেহার আসে, চাপ প্রয়োগ না করলে কিছুই আদায় হয় না। একজন নারী তার অর্থের অভাবে, ধর্মীয় পশ্চাৎপদতার কারণে মনোনয়ন পান না।

তিনি বলেন, নির্বাচন হওয়ার পূর্বশর্ত কিছু পালন হয়নি- বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেনি। যেসব থানার অস্ত্র লুট হয়েছে, সেগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। যাদের বৈধ অস্ত্র ছিল, সেগুলো জমা হয়নি। এই অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে ঐতিহাসিক নির্বাচন কিভাবে হবে।