প্রকৃতিনির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে রূপান্তরে অবদান রাখেন খালেদা জিয়া

Printed Edition

কাওসার আজম

এক সময় বাংলাদেশের কৃষি ছিল প্রধানত প্রকৃতিনির্ভর। বৃষ্টি, মৌসুমি আবহাওয়া ও সীমিত সেচের ওপর নির্ভরশীল এই খাতের উৎপাদন ছিল অনিশ্চিত। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়ত এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কৃষিকে আধুনিক ও উৎপাদনমুখী খাতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে একাধিক যুগান্তকারী নীতি ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ও সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে প্রকৃতিনির্ভর কৃষিকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর ধারায় নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।

কৃষি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে খাদ্য ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বাংলাদেশের কৃষিকে গভীর সঙ্কটে ফেলেছিল। সেচ সুবিধা সীমিত ছিল, সার সঙ্কট ছিল নিয়মিত ঘটনা এবং গবেষণার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাত না। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া কৃষিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করেন। যদিও ১৯৯৬ সালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তবে ২০০১ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কৃষি খাতে নীতিগত রূপান্তরকে আরো সুসংহত করেন।

১৯৯১-৯৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল সেচব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের ব্যাপক সম্পৃক্ততা। এর আগে সেচব্যবস্থা অনেকাংশে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন থাকলেও এই সময়ে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং সেচযন্ত্র ব্যবহারে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয়। এতে সেচ সুবিধা দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং বোরো মৌসুমে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ ধান উৎপাদনে এক ধরনের নীরব বিপ্লব সৃষ্টি করে এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে দেয়।

একই আমলে সার ব্যবস্থাপনায় আনা সংস্কার কৃষি খাতের আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। সারের আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়, ফলে দীর্ঘদিনের সার সঙ্কট ও কালোবাজারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। মাঠপর্যায়ে সময়মতো সার পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমে এবং ফলন বাড়ে। কৃষকদের আস্থার জায়গা থেকে এটি ছিল একটি বড় সাফল্য।

কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ ব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করাও খালেদা জিয়ার প্রথম আমলের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও পরিবেশ উপযোগী জাত দ্রুত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়। কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী প্লট ও মাঠদিবসের মাধ্যমে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ে। দেশের অন্যতম মেগা ভ্যারাইটি হিসেবে পরিচিত ব্রি ধান-২৮ ও ২৯ এই সময়েই উদ্ভাবন ও ছাড় দেয়া হয়, যা পরবর্তীতে খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্যিক ও বাজারমুখী খাতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই সময়ে কৃষি বৈচিত্র্যকরণ নীতি জোরদার হয়। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, আলু, সবজি ও ফল চাষে উৎসাহ দেয়া হয়। বিশেষ করে ভুট্টা চাষ সম্প্রসারণ পশুখাদ্য ও পোলট্রি শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের মধ্যে আন্তঃসংযোগ তৈরি করে।

এই মেয়াদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল কৃষিঋণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও সহজীকরণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কৃষিঋণ বিতরণে সক্রিয় করা হয়। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ায় তারা উন্নত বীজ, সার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সক্ষম হয়। এতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষিতে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নও এই আমলের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। গ্রামীণ সড়ক, হাটবাজার, সংরক্ষণাগার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সহজ হয়, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পায় এবং কৃষিপণ্যের অপচয় কমে। দুই আমলেই কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। পাওয়ার টিলার, থ্রেসারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে নীতিগত সহায়তা দেয়ায় শ্রমঘন কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমে আসে। একই সাথে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ায় উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।

মৎস্য খাতেও খালেদা জিয়ার সরকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রথম মেয়াদে বদ্ধ জলাশয়ে মাছচাষ সম্প্রসারণকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড হিসেবে জনপ্রিয় করা হয়। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে পুকুরভিত্তিক মাছচাষ গ্রামীণ আয়ের নতুন উৎসে পরিণত হয়। একই সময়ে চিংড়ি শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি ও রফতানি মান নিশ্চিত করায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী চিংড়ির অবস্থান শক্ত হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পায়।

সার্বিকভাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে খালেদা জিয়ার সরকারের নীতিগত উদ্যোগ ও সাফল্য বাংলাদেশকে খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করার ক্ষেত্রে তার শাসনামলের নীতিগুলো আজও বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় বলে কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।