নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য

অনুশোচনার লেশ নেই, বেপরোয়া আক্রমণ ও হুমকি সরকারকে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেয়া অডিও ব্যাপক গণহত্যা গুম-খুন, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থপাচারের জন্য অনুশোচনার পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেপরোয়া হুমকি এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির উসকানি দিয়েছেন। এতে তিনি সত্যকে আড়াল করে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের অপপ্রয়াস চালিয়েছেন, যেখানে ইতিহাস, ভয়, শত্রু ও জাতীয়তাবাদের উপাদানকে একত্র করে ক্ষমতা পুনর্দখলের ন্যক্কারজনক অপচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার পুরো বক্তব্যটিকে একটি গভীর কৌশলের অংশ বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি প্রেক্ষিতের আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়।

প্রথম বয়ান ‘জাতীয় অতল গহ্বর’ : বক্তব্যের শুরুতেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ‘অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়ানো’ একটি রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেন। ‘রক্তাক্ত দেশ’, ‘মৃত্যুকূপ’, ‘কারাগার’- এ শব্দগুলো দিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কটকে সাধারণ প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক সমস্যার বাইরে নিয়ে গিয়ে জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন পতিত প্রধানমন্ত্রী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একে বলা হয় অস্তিত্বগত কাঠামো- যেখানে জনগণকে বোঝানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রই টিকে থাকবে না। এ কৌশলের লক্ষ্য : ভয়ের মাধ্যমে সমর্থকদের পুনরায় সক্রিয় করা, মধ্যপন্থী ও অনিশ্চিত জনগোষ্ঠীকে পক্ষ নিতে বাধ্য করা, রাজনৈতিক বিরোধকে নৈতিক যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালানো।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বনাম ‘নতুন শত্রু’ : শেখ হাসিনা ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বঙ্গবন্ধুু’ ও ‘সংবিধানের’ কথা উল্লেখ করে একটি ধারাবাহিকতা নির্মাণ করার চেষ্টা করেন। তার ভাষ্যে বর্তমান সরকার শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়; তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত শক্তি।

এখানে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল লক্ষণীয়- ১৯৭১-এর শত্রু- ২০২৬-এর শত্রু; পাকিস্তানি দখলদার- ‘বিদেশী স্বার্থে বিক্রি হওয়া অভ্যন্তরীণ শক্তি’।

এ তুলনার মাধ্যমে তিনি বর্তমান সঙ্ঘাতকে তথাকথিত দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।

মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে ‘পূর্ণ শত্রু’ নির্মাণ : বক্তব্যের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অংশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। তিনি তাকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং খুনি, ফ্যাসিস্ট, রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদেশী শক্তির দালাল বলার ঔদ্ধ্যত্ব দেখিয়েছেন।

এটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিকরণ রাজনীতির চরম রূপ। এখানে সমস্যার উৎস হিসেবে কোনো কাঠামো, প্রতিষ্ঠান বা নীতিকে দায়ী করা হয়নি; বরং সবকিছুর জন্য একজন ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক ফলাফল হলো : সমঝোতা বা অন্তর্বর্তী সমাধানের রাস্তা বন্ধ করা, সমর্থকদের মধ্যে ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা জোরদার করে সঙ্ঘাত উসকে দেয়া এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ভাষাগত বৈধতার মোড়ক তৈরি করা।

মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ : আন্তর্জাতিক মহলের উদ্দেশে বার্তা

বক্তব্যের মাঝামাঝি অংশে শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী ও শিশু নিপীড়ন, সাংবাদিক গ্রেফতার এবং বিচার বিভাগের রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।

এ অংশটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক শ্রোতাকে লক্ষ্য করে তৈরি : জাতিসঙ্ঘ, পশ্চিমা কূটনৈতিক মহল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তিনি নিজেকে এখানে একটি ‘অপসারিত গণতান্ত্রিক নেতা’ এবং বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ ও দমনমূলক শাসন’ হিসেবে তুলে ধরতে চান- যা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ। একই সাথে তিনি সহিংসতা সৃষ্টির জন্য সমর্থকদের যে উসকানি দিচ্ছেন তার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে বলে মিথ্যাচারও করেছেন।

পাঁচ দফা দাবি : ন্যূনতম কর্মসূচি নাকি কৌশলগত আলটিমেটাম

শেখ হাসিনার ঘোষিত পাঁচ দফা দাবিকে আপাতদৃষ্টিতে তার ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা মনে হলেও গভীরে গেলে এটি একটি রাজনৈতিক আলটিমেটাম বলেই প্রতীয়মান হয়, যা সহিংসতার হুঁশিয়ারির নামান্তর।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়- অন্তর্বর্তী সরকারের বিকল্প কাঠামোর কথা নেই, নির্বাচনের সময়সূচি বা নিরপেক্ষ ব্যবস্থার বিস্তারিত নেই, ক্ষমতার রূপান্তর কিভাবে হবে, সে প্রশ্ন অনুচ্চারিত। ফলে এটি বাস্তবসম্মত কোনো রোডম্যাপের চেয়ে বেশি হলো শক্তির চাপ তৈরির ঘোষণাপত্র।

আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা : ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, দমন-পীড়ন ও রাষ্ট্রযন্ত্র অপব্যবহারের অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ বক্তব্যে শেখ হাসিনা সেই সঙ্কট মোকাবেলায় আওয়ামী লীগকে বহুত্ববাদী, অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী রক্ষক, হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চান। এটি মূলত তার একটি নৈতিক পুনর্বাসন প্রকল্প এবং নিজের করা অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা।

সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাত : এ বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব কয়েকটি স্তরে পড়তে পারে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হবে, সহিংস বয়ান স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে, সংলাপ ও সমঝোতার সম্ভাবনা কমবে। আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার ইস্যুতে নতুন করে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা চলতে পারে, জাতিসঙ্ঘ তদন্তের দাবিকে ঘিরে কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

শেখ হাসিনার এ বক্তব্য মূলত একটি সঙ্ঘাত-নির্ভর প্রত্যাবর্তন বয়ান। এটি সমাধানের চেয়ে সঙ্ঘাতকে গভীর করে, আপসের চেয়ে প্রতিরোধকে উৎসাহিত করে। তবে একই সাথে এটি স্পষ্ট করে দেয়- বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রশ্ন এখনো নিষ্পত্তিহীন, এবং সে লড়াইয়ের ভাষা ক্রমেই আরো কঠোর ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়- এ বয়ান কি সত্যিই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ দেখাবে, নাকি দেশকে আরও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এ প্রশ্নের উত্তরেই আবর্তিত হবে।