২৪ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- সর্বনিম্ন শ্রীমঙ্গলে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস
- বাইরে থেকে এখনো আসছে কুয়াশা
চলমান শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা কিছুটা কমলেও দেশের ২৪ জেলায় তা বয়ে যাচ্ছে। মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের এ শৈত্যপ্রবাহে জীবন যাত্রায় বিশাল প্রভাব ফেলেছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহে গতি কিছুটা মন্থর করে দিয়েছে। প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হতে চাইছেন না অনেকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে অনেক। অনেক স্কুলে নতুন বছরের বই পেলেও তারা কাস শুরু করেনি। ধারাবাহিক ঠাণ্ডায় রোগ-শোক বাড়ছে। বিশেষ করে সর্দিজ্বর ও কাশির প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে আউট ডোরে অথবা চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে এখন সর্দি-কাশি ও হাঁপানির রোগী বেশি। শীতজনিত নানা রোগে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যা বেশি বলে চিকিৎসকরা বলছেন। কারণ, এই দুই শ্রেণীর মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে কম, ফলে তারা ভুগছে বেশি।
চলতি শৈত্যপ্রবাহের জন্য কুয়াশা অনেকটা দায়ী। প্রচুর কুয়াশা হওয়ায় দিনের বড় একটি অংশ সূর্যালোক পায় না। বিশেষ করে, দুপুরের রোদ থাকে কড়া, সে সময়টা কুয়াশায় ঢাকা থাকে সূর্য। ফলে বিকেল থেকে আবারো সার্বিক তাপমাত্রা কমতে থাকে। দিনের অংশটি গরম না হওয়ায় রাতটা হয়ে ওঠে দীর্ঘ অসহনীয়।
আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল বলছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের দিক থেকে প্রচুর কুয়াশা আসছে বাংলাদেশে। কুয়াশার সাথে থাকছে ধোঁয়া, ভারী ধাতু কণা। এই কুয়াশা শুধু যে বাংলাদেশে ঠাণ্ডা বাড়াচ্ছে তা নয়, পরিবেশও দূষিত করছে।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের তাপমাত্রাও অনেক কমে গেছে। সব মিলিয়ে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলা, রংপুর বিভাগের ৮ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, খুলনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া জেলায় বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। আজ শুক্রবার সারা দেশের দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে তবে গতকাল দিবাগত রাতের তাপমাত্রা আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকতে পারে। সারা দেশে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং অন্যত্র তা হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে শীতের তীব্রতা, শৈত্যপ্রবাহের সময়কাল এবং এর বিস্তারের পেছনে জেটস্ট্রিমের ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, জেটস্ট্রিম বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে থাকে। তবে শীতকালে ঠাণ্ডা বায়ুর এই স্ট্রিম মাটি থেকে ৯ থেকে ১২ কিলোমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে বাংলাদেশের শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকে। অন্য দিকে, শীতকালে উত্তর গোলার্ধে পোলার জেটস্ট্রিম বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই জেটস্ট্রিম উত্তর মেরু অঞ্চলের অত্যন্ত শীতল বায়ু এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের তুলনামূলক উষ্ণ বায়ুর মধ্যবর্তী সীমারেখা হিসেবে কাজ করে। যখন জেটস্ট্রিম অপেক্ষাকৃত সোজা পথে প্রবাহিত হয়, তখন শীতল বায়ু সাধারণত মেরু অঞ্চলের কাছাকাছিই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু জেটস্ট্রিম ঢেউয়ের মতো বেঁকে দক্ষিণ দিকে নেমে আসলে উত্তর দিকের শীতল বায়ু অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। তখনই শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ে এবং বাংলাদেশে প্রচুর শীত পড়ে। আবার শীতে পোলার জেটস্ট্রিম দক্ষিণ এশিয়ার দিকে নেমে এসে শীতের মাত্রা বাড়িয়ে থাকে। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে চলা এই জেটস্ট্রিমের দক্ষিণমুখী বিচ্যুতির ফলে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে শীতল ও শুষ্ক বায়ু নিয়ে এসে উত্তর ভারত হয়ে বাংলাদেশের উপরে প্রবেশ করে। এর ফলে তাপমাত্রা হঠাৎ করে কমে যায় এবং কয়েক দিন ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শীত অনুভূত হয়। রাতের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের প্রধান বৈশিষ্ট্য। জেটস্ট্রিমের কারণেই এমন ঘটে থাকে।
জেটস্ট্রিমের অবস্থান ও শক্তির ওপর শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা অনেকাংশে নির্ভর করে। শীতে জেটস্ট্রিম দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের কাছাকাছি দক্ষিণে অবস্থান করলে শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তীব্রতা বাড়ে। আবার জেটস্ট্রিম দ্রুত উত্তর দিকে সরে গেলে শীতের মাত্রা তুলনামূলক দ্রুত কমে আসে। এ কারণে দেখা যায়, কোনো কোনো শীতে একাধিক দফায় শৈত্যপ্রবাহ হলেও তার স্থায়িত্ব ও মাত্রা একরকম হয় না।
গতকাল সকাল থেকেই সূর্যালোক থাকায় দিনের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। ঢাকায় দিনের তাপমাত্রা আগের দিন বুধবারের চেয়ে অর্ধেক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এতে শীতের মাত্রা কমাতে পারেনি, আগের মতোই ছিল। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ শুক্রবারও সূর্য দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, দিনের তাপমাত্রাও কিছুটা বাড়তে পারে।