জামসেদ ওয়াজেদ : তার নির্বাচিত সনেট

Printed Edition
Sahitto-4
জামসেদ ওয়াজেদ : তার নির্বাচিত সনেট

রাসেল আবদুর রহমান

কবিতাপ্রেমী ও সাহিত্যবোদ্ধাদের সনেট নিয়ে ভিন্নরকমের আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহের মূল কারণ কী হতে পারে মনে করেন? কেউ হায়তো ভাবতে পারেন আইম্বিক পেন্টামিটার আবার কেউ হয়তো মনে করেন ভাবের সরল বিন্যাস। এসব মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় তবে সনেটের আসল মজা বা আকর্ষণ হলো ভোল্টা। ভোল্টায় কবির শক্তিমত্তা প্রকাশ পায় এবং সনেট অনন্য হয়ে ওঠে। মিটারিক বা মাত্রিক চাল ঠিক থাকাই সনেট নয়, তবে সনেটে মাত্রার গাণিতিক চাল অপরিহার্য।

উত্তরাধুনিক কবিরা কবিতা নির্মাণে বেশ স্বাধীনচেতা। তারা নিয়মের বেড়াজালে বন্দী হতে অথবা থাকতে মোটেই পছন্দ করেন না। তাই কবিতা সম্ভারে সনেট তুলনামূলক বেশ কম। বাংলা কবিতায় সনেট শুধু বর্তমানে নয় অতীতেও কম ছিল। তবে সনেট চর্চা একেবারে থেমে নেই। উত্তরাধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে কবি জামসেদ ওয়াজেদ নিরলসভাবে সনেট কবিতা লেখায় ব্রতী। তিনি সনেট রচনায় কতটা ধ্যানমগ্ন তার প্রমাণ ‘নির্বাচিত সনেট’।

এ যাত্রায় কবি জামসেদ ওয়াজেদের ‘নির্বাচিত সনেট’ বইটিতে মুদ্রিত করিতার স্বাদ আস্বাদনের চেষ্টা চালাব। ভিন্নভাবে বলতে গেলে- আমার পাঠ অনুভূতি আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করব।

প্রথমে, কবিতার শরীর ও গঠনশৈলী নিয়ে আলোচনা করা আবশ্যক। কবি ইতালীয় পেট্রার্কান (Petrarchan) রীতি অনুসরণ না করে শেকসপিয়রীয় (Shakespearean) রীতিতে নির্মাণ করেছেন কবিতাশরীর অর্থাৎ তিনটি চার লাইনের স্তবক (Quatrain) এবং শেষে দুই লাইনের একটি অন্ত্যমিলের (Couplet)। এই বইয়ের কবিতাগুলো আঙ্গিক গঠনের মতো অন্ত্যমিলও হুবহু শেকসপিয়রিয়ান।

ইংরেজি সনেটে সাধারণত আইম্বিক পেন্টামিটার ব্যবহৃত হয়, যেখানে প্রতি লাইনে ১০টি সিলেবল থাকে কিন্তু বাংলাতে অক্ষরবৃত্তে ১৪ মাত্রা বা ১৪ অক্ষর। উচ্চারণে অক্ষরগুলো মুড়ির মতো ঝরঝরা হয়। যেমনটি কবির ‘আঁচলে সমুদ্র রেখে’ কবিতায় দেখা যাচ্ছে-

‘এখানে বনেরা যেন বেঁচে আছে সবুজ বিলাতে

অথচ বনের প্রতি যেন আজ কমে গেছে মায়া

বনহীন জনপদে কী করে যে খুঁজি আলো ছায়া

কত যুগ কেটে যায় এই ভাবে হিসাব মিলাতে’

বেশ সহজ ও সাবলীল শেকসপিয়ারিয়ান। ইতালির বাইরে সনেটের এই রীতিই বেশ জনপ্রিয় এবং কবিদের চর্চায় ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কেবল ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ পেত্রার্কীয় রীতিতে সনেট লিখলেও অন্ত্যমিলে নতুনত্ব এনেছে। যার গাণিতিক বিন্যাস : কখখক : কগগক : ঘঙঙঘ : চচ। কবি সনেটের নিয়ম-রীতিগুলোর টুইস্ট ঘটিয়েছেন বা নিয়মে নিয়মে বিয়ে দিয়েছেন। কবি তার কবিতায় নতুনত্বের স্বাদ দেয়ার চেষ্টাকে অদমিত রেখেছেন। কবিতার অগ্রযাত্রা এমন হওয়াটাই কাম্য।

কবিতায় মাত্রার গাণিকতার মুক্তি দেয়া সম্ভব হলেও কখনো ছন্দের মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর উক্তি উল্লেøখ করা প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘ছন্দ কিন্তু সবসময় চাই। আগেও চাই পরেও চাই। ছন্দ আছে সর্বত্র। কুঁড়েঘরেও আছে, আবার আকাশছোঁয়া অট্টালিকাতেও আছে। (কবিতার ক্লাস)’ বলা প্রাসঙ্গিক, মাত্রা বা অক্ষরের গাণিতিক চাল বা বিন্যাস ঠিক রাখলেও সু-ছন্দ বা ছন্দ-সাবলীল কবিতা নাও হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না ছন্দের আসল কাজ হলো বাক্যের সাবলীলয়তা এবং উচ্চারণের গতীয় দ্যোতনা ও শ্রুতিময়তা বজায় রাখা। পড়তে গিয়ে যদি পাঠকের কণ্ঠের অবনমন ঠিক না থাকে বা উচ্চারণে ছেদ ঘটে তবে সেখানে যতই গাণিকতা ঠিক থাকুক না কেন, গণিতের সুষ্ঠু প্রয়োগ হয়নি। আসলেই আমরা ছন্দ চাই কবিতায় ও সহজ সুন্দর কথা বলায়। তা না হলে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হবে। তাই প্রসঙ্গক্রমে এখন আমরা সনেট কবিতার আরোপিত বিষয়গুলো নিয়ে কবি জামসেদ ওয়াজেদের কবিতার বিচিত্র স্বাদ ও ছন্দ বিন্যাস চিত্রায়িত করব। যেহেতু এখানে সনেটের কাব্য নিয়ে আলোচনা করব তাই বলা আবশ্যক, ১৪ পঙ্ক্তিযুক্ত এবং সনেটীয় অন্ত্যমিল সম্পন্ন কবিতামাত্রই সনেট নয়। রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি ‘চৈতালি’, ‘স্মরণ’ ও ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের চতুর্দশ-পঙ্ক্তি কবিতাগুলোসহ কাহ্নপাদ থেকে ঈশ্বরগুপ্ত পর্যন্ত বহু কবি বাংলা ভাষায় চতুর্দশ-পঙ্ক্তি কবিতা রচনা করেছেন, যেগুলোতে সনেটের গুরুগম্ভীর ভাব ও সংহত গঠনশৈলী দৃষ্ট হয় না। একটি কবিতাকে আদর্শ সনেট বলা যাবে তখনই, যখন এর ভাব-প্রবাহ সনেটীয় রীতিতে প্রবহমান থাকবে এবং এর অন্ত্যমিলও সনেটীয় রীতি দ্বারা বিরচিত হবে।

শুরুতেই বলেছি ‘নির্বাচিত সনেট’ কবিতার বইয়ের সবগুলো কবিতা শেকসপিয়ারিয়ান রীতির অর্থাৎ চার লাইনের তিনটি স্তবক এবং শেষে দুই লাইনের একটি কাপলেট এবং অন্ত্যমিল : কখকখ : গঘগঘ :: ঙচঙচ : ছছ।

মাত্রা বা অক্ষরের স্বতন্ত্রতা অমিত্রাক্ষর কবিতার অনন্য বৈশিষ্ট্য। অক্ষরের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনেক শব্দ তৈরি করেছেন। দু’টি শব্দকে একটি শব্দে পরিণত করেছেন। বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সনেট ‘কবি-মাতৃভাষা’ কবিতাটি দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। অমিত্রাক্ষর মানে মুক্তস্বর। যেমন কবি জামসেদ ওয়াজেদের কবিতায় পাই- ‘বিপুল রহস্য মনে পুষে রাখি পরিমিতি বোধ’। -একাকী অরণ্যহীন

তবে, ‘আমার কবিতা’ কবিতায় ‘সাইবেরিয়ার সেই পেঙ্গুইন হাঁটি হাঁটি পা পা’ এ পঙক্তিটি যদি কপোতাক্ষ নদ কবিতার ‘সতত, হে নদ, তুমি পড়ো মোর মনে’ এই পঙক্তির পাশাপাশি বসাই তবে স্পষ্ট হয় ‘সাইবেরিয়া’ শব্দটি অমিত্রাক্ষর ছন্দের অক্ষরের সাথে সাংঘর্ষিক। চৌদ্দ অক্ষরের জন্য শব্দের শরীরে অনেক পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন হয়। যদি এমনটি না করা হয় তবে কী হয়? কী হয় সেটি কবিতা পড়ার সময়ই টের পাওয়া যায়। কবিতার প্রয়োজনে শব্দে যোজন-বিয়োজন কাম্য। এতে শুধু নতুন শব্দের জন্ম হয় না, ভাবেও নতুনত্ব আসে। কবি নির্বাচিত সনেট বইয়ে অনেক শব্দ যেমন- নাকফুল, হয়তোবা, মাহমুদ, নায়কগণ, কাচগৃহে-সহ বেশ কিছু শব্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দে মাত্রাসিদ্ধ করতে চেয়েছেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দে এই শব্দগুলোর মাত্রাভিত্তিক ভবিষ্যৎ কবির কবিতার পঙক্তিতেই বলে দেয়া সম্ভব- ‘এখন আমরা হাঁটি মোহময় অনিশ্চিত এই অন্ধকারে’ (অনিশ্চিত এই অন্ধকারে)। সত্যবিচারে দুটো দিক ফুটে ওঠে- এক. ন্যায়পরায়ণতা, দুই. নির্মমতা। বিচার বিচারের নিয়মে চলবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্মমতার ভেতরে ও বাইরে দুলতে থাকে নানাবিধ বিষয়। কবিতার শরীরজুড়ে পঙক্তির মোড়ে মোড়ে ছড়িয়ে থাকে নান্দনিকতা। এ জন্যই কবিতা এত বেশি আলোচিত। যার কোনো অক্ষরজ্ঞান নেই তার কণ্ঠেও কবিতা উচ্চারিত হয়। হাঁটতে হাঁটতে, বসতে বসতে, বলতে বলতে সেও কবিতা বানায়।

কবি জামসেদ ওয়াজেদ নান্দনিক কবিতার কবি। তার কবিতার শিরোনামের নান্দনিকতা উল্লেখ করার মতো। একটু জোর দিয়ে বললে বলা যায়- কিছু কিছু শিরোনামই যেন একটি অর্থবহ কবিতা। যেমন- ‘পাখিগুলো হয়ে যাবে ফুল’ এমনই একটি কবিতার নাম। তিনি কবিতায় তুলে এনেছেন দগ্ধস্মৃতি, দুরন্তচিন্তা, সময়ের বাস্তবতা এবং উপমায় আবদ্ধ করেছেন প্রাকৃতিক উপাদান, পরাবাস্তবতার জাদুচিত্র তৈরিতে ব্যবহার করছেন বাস্তব সব শব্দ। প্রশংসার এই বয়ানের পক্ষে তুলে ধরছি কবির একটি কবিতার একটি স্তবক-

‘অভাবী শরীর জুড়ে শুধু মাখি কল্যাণের রোদ

এর চেয়ে কম দামে কিবা আছে বলো পৃথিবীতে

আয়নিক হস্তরেখা বোঝে না তো মানুষ নির্বাধ

সময়ের চক্র বাঁকে ফিরে আসে আপন অতীতে

যুগল মেকুর

কবি তার কবিতায় উত্তরাধুনিকতার পরবর্তী চিন্তাকে ধারণ করছেন কবিতার গাঠনিক শৃঙ্খলে থাকে। কবির ভাষায়- ‘সুবোধ বালক দেশে আজ-কাল পার করে যুবক সময়’ এমন সময় কবি নিজে কবিতা চর্চায় থেকেছে খাঁটি। সত্যিই অবাক করা সময় এখন। কবির ‘সবুজ নিশান’ কবিতার এই পঙক্তিটি পড়তে গিয়ে কবি ইমরান মাহফুজের কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল ‘এখন ফোটে না, ফুটাই’।

একজন কবির কবিতা পড়তে গিয়ে যদি অন্য আরেক কবির কবিতা অনায়াসে মনে চলে আসে তবে সেই কবির কবিতাকে যুগসচেতন কবিতা বলা যায়। কবিকে অবশ্যই যুগসচেতন হতে হয়।

‘অদ্ভুত সকাল আজ পুলকিত আমার হৃদয়’-কবির ‘নির্বাচিত সনেট’ বইয়ের কবিতা পড়ে আমার হৃদয়ও এখন কবির ওই পঙক্তির মতো। কবিতা পিপাসু এই আমি কবিতার শরীরে ডুব দেই আর রূপ খুঁজি। কবির এই কাব্যের কবিতায়ও পেয়েছি বেশ রূপ ও রস। যেমন- ‘তোমাকে দেখেনি যারা পায়নি তো রূপের খবর/ এ রাত্রি আঁধার বটে তথাপিও পথিক প্রবর’। সত্যি চমৎকার। পড়তে পড়তে মুগ্ধ হই। ‘দৃপুর নিখোঁজ ছিল’ কবিতাটি সত্যি অনন্য।

কবিতার বিতানে ‘নির্বাচিত সনেট’ বইটি কেন ভিন্নতর তার আরো কিছু নির্দেশন উপস্থান না করলে আলোচনার কলেবর অপূর্ণ থেকে যাবে। বইয়ের কবিতাগুলোর ভিন্নতর আসলে কবিতার মূলভাব ও উপমায়। যেমন- ‘মানুষ আকাশ হলে পাখিগুলো হয়ে যাবে ফুল’ অথবা ‘বাতাসে ই‘মেল ওড়ে আরো ওড়ে ষোড়শীর চুল’। কবি জীবনবোধ তুলে ধরেছেন ভিন্ন ভঙ্গিমায়। বদলে দিয়েছেন আকাক্সক্ষার প্রার্থনা। কবির ভাষায়-

‘একটি হাসির জন্য নিত্য ফোটে পৃথিবীর ফুল

তোমাকে চাই না আমি হাসিটির খুব প্রয়োজন।’

একজন উত্তরাধুনিক সনেটকারকের কাছে সনেট প্রিয়দের নতুন কিছুর প্রত্যাশা খুব স্বাভাবিক। সনেটের প্রাণ ভোল্টায় দুরন্ত স্পিন অবশ্যই প্রত্যাশার।

বইটিতে ১৫০টি কবিতা রয়েছে। গঠনশৈলী এক হলেও ভাব ও ভাষার বিচিত্রতায় কবিতাগুলো ভিন্নতায় রূপ নিয়েছে। যা পাঠক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে বোধকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।