গিবতের কাফফরা বা প্রায়শ্চিত্ত

Printed Edition
islami logo
গিবতের কাফফরা বা প্রায়শ্চিত্ত

জাফর আহমাদ

আপনার দ্বারা যদি কারো গিবত সঙ্ঘটিত হয়ে যায় এবং সাথে সাথে আপনার বিবেক জাগ্রত হয়ে যায় বা বিবেকের দংশন শুরু হয়ে যায়। তা হলে আপনার জন্য মহাসুযোগ অপেক্ষা করছে, আর তা হলো, গিবতের কাফফরা বা প্রায়শ্চিত্ত করা। প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আপনাকে নিচের চারটি কাজ করতে হবে। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা এই চারটি কাজের সুপারিশ করেছেন। যথা :

প্রথমত : গিবতের মতো একটি মারাত্মক পাপাচারের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং সুদৃঢ়ভাবে তাওবা করুন যে, আমার দ্বারা আর কোনো দিন অন্য কারো সম্মানহানি হবে না, আমি কোনো দিন কারো গিবতে লিপ্ত হবো না। অর্থাৎ তাওবাতুন নাসুহা করে সঠিক কর্মনীতিতে ফিরে আসতে হবে।

দ্বিতীয়ত : যার গিবত করেছেন সম্ভব হলে, সেই গিবতের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবহিত করুন এবং অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে অত্যন্ত নম্রভাবে তার কাছে ক্ষমা চান। আপনি বলেন, আমি শয়তানের প্ররোচনায় আপনার সম্পর্কে অন্যের কাছে গিবত করে ফেলেছি। এখন আমি খুবই অনুতপ্ত ও লজ্জিত, আমার বিবেক খুবই কষ্ট দিচ্ছে এবং আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন তাহলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব।

তৃতীয়ত : যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে এ আশঙ্কা থাকে যে, তার কাছে গিবতের কথা প্রকাশ করা হলে সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে অথবা তিনি হইচই বাধিয়ে দিয়ে পরিবেশের অবনতি ঘটাতে পারেন। তাহলে আপনি চার নম্বর কাজটি করবেন।

৪. যাদের সামনে আপনি ব্যক্তির গিবত করেছেন, তাদের সামনে তার প্রশংসা করবেন এবং পূর্বের বলা কথাগুলো প্রত্যাহার করে নেবেন আর এই অনাকাক্সিক্ষত আচরণের জন্য নিজের ভুল স্বীকার করবেন।

গিবত একটি সামাজিক অপরাধ। কারণ এর মাধ্যমে সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। গিবত অর্থ পরনিন্দা। কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা। হতে পারে দোষটি তার মধ্যে বিদ্যমান আছে। কিন্তু এই আলোচিত দোষটির কথা শুনলে সে মনে কষ্ট পাবে। তা হলে এটাই হলো গিবত। গিবতের পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নবী সা:-এর হাদিস থেকে জানা যায়। তাঁকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন : আপন ভাইয়ের কোনো দোষত্রুটির আলোচনা তার পেছনে এমনভাবে করা যা তার কাছে পছন্দনীয় নয়। সাহাবি আবারো জিজ্ঞেস করলেন, দোষটি যদি সত্যিকারার্থে তার মধ্যে থাকে। নবী সা: বললেন : তার মধ্যে আছে বলেই তা গিবত। না থাকলে তো মিথ্যাচার হবে। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৭৪) কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হলো, বর্তমানে গিবত এতটাই মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, চায়ের আসর থেকে শুরু করে মিডিয়া, স্বাভাবিক আলাপ-আলোচনা ও সভা-সমিতিতে সর্ব জায়গায় মহামারী আকারে গিবত ছড়িয়ে পড়েছে। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আল্লাহর ঘর মসজিদে বসেও অনেকে এই গর্হিত পাপ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। খুবই হাস্যকর বিষয় হলো, আমাদের দেশের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে বক্তা সাহেব গিবতের খারাপ দিকগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। কিন্তু তার আলোচনার কোনো একপর্যায়ে এসে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গিবত বলতে শুরু করেন। সমাজের পরিচিত নেককার বান্দা নামে খ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যেও গিবত চর্চার অভ্যেস লক্ষ করা যায়। সুস্থ-সবল মানুষগুলো নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাবলে খাবলে খাচ্ছে। মুখের দু’পাশ দিয়ে চিবানো গোশত বেরিয়ে আসছে। কী এক বীভৎস চিত্র। অনেকে বলে, কী বলব ভাই? বললে তো গিবত হয়ে যাবে। এই ভূমিকার পরপরই শুরু হয় গিবতের ধারাবাহিক বর্ণনা। নবী রাসূল ছাড়া পৃথিবীতে কোনো মানুষই দোষত্রুটি ও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু ইসলাম সেই ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। এমনকি সেই দোষচর্চা শোনাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গিবত যেভাবেই বলা হোক, গিবত গিবতই। কারো দোষত্রুটি তার অনুপস্থিতিতে করলেই তার গিবত হবে। গিবত করা কবিরা গুনাহ এবং এর শাস্তি ভয়াবহ। আনাস ইবনে মালিক রা: সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : মিরাজের রাতে আমি এমন এক কওমের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম যাদের নখগুলো তামার তৈরি এবং তা দিয়ে তারা অনবরত তাদের মুখমণ্ডল ও বুকে আঁচড় মারছে। আমি বললাম, হে জিবরীল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক যারা মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ গিবত করত) এবং তাদের মানসম্মানে আঘাত হানত। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৭৮, কিতাবুল আদাব, বাবু ফিল গিবাতে, আহমাদ)

আবু বারযাহ আল আসলামী রা: সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : হে লোকেরা! যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছ কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৮০, কিতাবুল আদাব, বাবু ফিল গিবাতে, আহমাদ, হাদিসটি হাসান সহিহ)।

আল মুসতাওরিদ রা: সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের গিবত করে এক লোকমা ভক্ষণ করবে আল্লাহ তাকে এজন্য জাহান্নাম থেকে সমপরিমাণ ভক্ষণ করাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের দোষত্রুটি বর্ণনার পোশাক পরবে আল্লাহ তাকে অনুরূপ জাহান্নামের পোশাক পরাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির (কুৎসা) রটিয়ে খ্যাতি ও প্রদর্শনীর স্তরে পৌঁছাবে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে ওই খ্যাতি ও প্রদর্শনীর স্তরে পৌঁছাবে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে ওই খ্যাতি ও প্রদর্শনীর জায়গাতেই (জাহান্নামে) স্থান দিবেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৮১, কিতাবুল আদাব, বাবু ফিল গিবাতে, আহমাদ, হাদিসটি সহিহ)

সাহল ইবনে মু’আয ইবনে আনাস আল জুহানী রহ: থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সা: বলেছেন : যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে মুনাফিক থেকে রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার শরীর জাহান্নাম থেকে রক্ষার জন্য একজন ফেরেশতা প্রেরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তাকে দোষারোপ করবে তাকে মহান আল্লাহ জাহান্নামের সেতুর ওপর প্রতিরোধের ব্যবস্থা করবেন যতক্ষণ না তার কৃতকর্মের ক্ষতিপূরণ হয়। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৮৩, কিতাবুল আদাব, বাবু মান রাদ্দা আন মুসলিমিন গীবাতান, আহমাদ, হাদিসটি হাসান)

গিবতের কাফফরা হলো, যার গিবত করা হয়েছে তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। বেশি বেশি ইস্তেগফার করা। মনে মনে অনুতপ্ত হয়ে এটি যে একটি গুরুতর পাপ তা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করা। আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর কাছে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া যে, জীবনে তার দ্বারা আর কোনো ব্যক্তির দোষত্রুটির চর্চা হবে না। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আবার ঘুম যাওয়ার আগ পর্যন্ত সারা দিনের সব কথা, কাজ ও পারস্পরিক যোগাযোগের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মুখ থেকে যেন কারো সম্পর্কে গিবত বেরিয়ে না আসে। যদি গিবত হয়েই যায়, সম্ভব হলে সেই ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করা। যেমন তাকে সাহায্য করা বা তার গোপন কথা প্রকাশ না করা। রাসূলুল্লাহ সা: প্রতিদিন সকালের জন্য একটি দোয়া শিখিয়েছেন, তা হলো, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি ক্বাদ তাসাদাকতু বিইরদি আলা ইবাদিকা।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমি আমার মর্যাদা ও সম্মান তোমার বান্দাদের জন্য দান করে দিলাম।’ আবদুর রহমান ইবনে আজলান রা: সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমরা কি আবু দামদামের মতো হতে পারো না? সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, আবু দামদাম কে? তিনি বললেন, ‘তোমাদের পূর্বের যুগের একজন মানুষ। তিনি প্রতিদিন সকালে এ বাক্যটি বলতেন। (উপরে উল্লেখিত দোয়াটি) তিনি বলতেন, আমাকে যে গালি দেয় আমি আমার সম্মান তাকে দান করলাম। (আবু দাউদ : ৪৮৮৭, কিতাবুল আদাব, বাবু মা জা’আ ফির রাজুলিন)।

লেখক : প্রাবন্ধিক