বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় কওমি মাদরাসা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কুরআন, হাদিস, ফিকহসহ ইসলামের নানা বিষয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ানো হয়। ফলে চাকরির সুযোগ সঙ্কুচিত হলেও মানুষ তাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য কওমি মাদরাসায় পাঠায়। প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্বলতার সুযোগে কিছু কওমি মাদরাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এতে কওমি মাদরাসা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সম্মানিত শিক্ষক ও আলেমদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্ম নিচ্ছে। শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলো স্বচ্ছ তদন্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার।
একটি খবরে বলা হয়েছে, রাজধানীর অদূরে সাভারের একটি কওমি মাদরাসায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক দম্পতি তাদের সাত বছরের সন্তানকে ভর্তি করান। কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই এই শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন হয়। শিশুটি উপর্যুপরি মাদরাসার ছাত্র এমনকি শিক্ষকের কাছ থেকে একই পীড়নের শিকার হয়। কোনো পর্যায় থেকে সে প্রতিকার পায়নি। সাত মাস ধরে নির্যাতিত হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ পায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাব-মা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এবং পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতারও করেছে। কওমি মাদরাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর এটি প্রথম নয়; এমন খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ধামাচাপা দেয়া হয়।
কওমি ধারার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে সরকার, কোনো সংগঠন কিংবা সংস্থার অনুমোদন লাগে না। ফলে চাইলে অনায়াসে যে কেউ যেকোনো স্থাপনায় এ ধরনের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী অসৎপ্রবণতার লোক। ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদের সন্তানদের এসব মাদরাসায় ভর্তি করান। অভিভাবকরা সন্তানদের ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে মাদরাসায় থাকার পরিবেশ কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা— কোনো বিষয়েই খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। কোনো বৈধ কর্তৃপক্ষ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাচ্ছেন নামধারী মোহতামিম বা শিক্ষক। আদতে তারা এই পদবি পাওয়ার যোগ্য কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এরাই শিশুদের যৌন নির্যাতনের সুযোগ নেন। আবাসিক মাদরাসাগুলোতে বাস্তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকে না। ছাত্র-শিক্ষক মেঝেতে গাদাগাদি করে ঘুমান। এতে যৌন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এদিকে এই দোষ চাপছে ঢালাওভাবে কওমি মাদরাসার ওপর, যা কোনোভাবেই সঙ্গত নয়।
এ ধরনের মাদরাসায় যেখানে শিশুরা রয়েছে সেখানে সিসি টিভির ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে দোষীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কওমি মাদরাসার ওপর এ দেশের মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে সবাইকে দায়ী করা যাবে না।
কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু যৌন অপরাধসহ আরো কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে, যেগুলো প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নেই। কওমি মাদরাসাগুলোকে শৃঙ্খলার আওতায় আনার জন্য একটি ন্যূনতম প্রশাসনিক নিয়মনীতি চালু করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনার অবসান হতে হবে।