বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শিরোপার লড়াই

আর্জেন্টিনার চতুর্থ নাকি স্পেনের দ্বিতীয়

Printed Edition
first-3
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে দুই দলের কোচ ও অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন : ইন্টারনেট

রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে

বিভিন্ন আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, রেকর্ড, সাফল্য ও ব্যর্থতার বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শেষ হতে যাচ্ছে আজ রাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হবে এবারের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ বা ফাইনাল খেলা। তিন স্বাগতিক দেশ মিলে ৪৮ দলের লড়াই শেষে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে শিরোপা, আর্জেন্টিনা নাকি স্পেন- সে উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হতে পারে রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা গড়িয়ে পৌনে ৪টা পর্যন্ত। ৯০ মিনিটেই সব সাঙ্গ হলে বাড়তি সময় আর রাত জাগতে হবে না ফুটবলভক্তদের। এই বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা কি তাদের ভান্ডারে চতুর্থ ট্রফি জমা করবে নাকি স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো চার বছরের জন্য বিশ্বসেরা হবে। রেকর্ড গড়ে লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠবে, নাকি টিনএজ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালরা শিরোপার উৎসবে মাতবেন- সে উত্তরই জানা যাবে আজ।

এবারই প্রথম ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা চার দল তাদের নাম ও র‌্যাংকিংয়ের সাথে মিল রেখে খেলেছে সেমিফাইনালে। সেই সেমিতে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে এবং স্পেন ২-০ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে আসে। এই ফাইনালে যারা জিতবে তারা আগামী চার বছর অর্থাৎ ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্বসেরার অফিসিয়াল স্বীকৃতি পাবে।

স্পেন জিতলে এটি হবে তাদের ২০১০ সালের পর ফের ট্রফি হাতে নেয়া। আর আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে ইতালি ও ব্রাজিলের মতো টানা দু’বার বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্বে ভাগ বসাবে। কাতারের মাঠে ২০২২ ফ্রান্সকে হারিয়ে যে সাফল্য তারা পেয়েছিল, তা ধরে রেখে টেনে নিতে পারবে আরো চার বছর। চলে আসবে ইতালি, জার্মানির কাতারে। যারা চারবার করে জয় করেছিল বিশ্বকাপ। আর স্পেন জিতলে সমকক্ষ হবে ফ্রান্স ও উরুগুয়ের। যাদের ভাণ্ডারে দু’টি করে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব।

এই বিশ্বকাপ একই সাথে দুই মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইও। আর্জেন্টিনা ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। আর স্পেন ২০২৪ সালের ইউরোর শিরোপা জয়ী। দুই মহাদেশের এই দুই চ্যাম্পিয়নকে নিয়ে কোপা ফিনালিসিমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। আগের কোপা ফিনালিসিমাতে আর্জেন্টিনা হারিয়েছিল ইতালিকে। ফলে মেটলাইফের এই ফাইনাল একই সাথে পুরো বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এবং ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে কে সেরা সেটাও নির্ধারণী।

স্পেনের এবারের বিশ্বকাপে শুরুটা হতাশার ছিল। অবশ্য তা ২০১০ সালের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের মতো নয়। সেবার তারা সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর ফাইনালে জিতে রেকর্ড। স্পেনের আগে আর কোনো দল প্রথম ম্যাচে হেরে এরপর চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। স্প্যানিশদের সেই রেকর্ড আর্জেন্টিনা ভাগ বসিয়েছে ২০২২ সালে। সেবার তারা প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে এরপর ট্রফি নিয়েই চাটার্ড বিমানে দেশে ফিরেছিল। এবার স্পেন প্রথম ম্যাচে অখ্যাত এবং এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলা কেপ ভার্দের সাথে গোলশূন্য করে। পরে অবশ্য আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। একে একে সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ তো হারিয়ে নক আউটে উঠে। এরপর সেরা ৩২ এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০, সেরা ১৬ এর ম্যাচে পর্তুগালকে ১-০, কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে, সেমিতে ফ্রান্সকে ২-০ তে হারিয়ে ফাইনালে আসে।

আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বটা সাবলীলভাবেই শেষ হয়েছিল। প্রথম ম্যাচে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে ৩-০ তে আলজেরিয়াকে উড়িয়ে দেয়া। এরপর অস্ট্রিয়াকে ২-০, জর্দানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নক রাউন্ডে আসা। কিন্তু সেরা ৩২ থেকেই তাদের ধুঁকতে হয়েছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে দুই দফা লিড নিয়েও তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে এসে ৩-২ এ জয়। সেরা ১৬-এর ম্যাচে মিসর তো ২-০ গোলে লিড নিয়েছিল। এরপর শেষ ১৩ মিনিটে ৩ গোল দিয়ে ৩-২ এ জিতে নেয়া মেসিদের। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লিড নিয়েও এরপর সেই খেলা ১২০ মিনিট খেলে জিততে হয়েছিল ৩-১-এ। পরে সেমিতে পিছিয়ে পড়েও ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে এখন ফাইনালে; অর্থাৎ এই পোড় খাওয়া দলই ফাইনালে উঠেছে। তবে মেসিদের মতো এত কঠিন সংগ্রাম করতে হয়নি স্পেনকে। প্রতি ম্যাচই বাদ পড়ার শঙ্কা নিয়ে অবশেষে সেরা দুইয়ে আসা আর্জেন্টিনার।

আর্জেন্টিনা ও স্পেন এর আগে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথম পরস্পরের সাথে ম্যাচ খেলেছিল। সেই ম্যাচে অবশ্য ২-১ গোলে জয় ল্যাতিন দেশটিরই। দুই দেশ এ পর্যন্ত ১৪টি ম্যাচ খেলেছে। এতে উভয় দলেরই জয়ের সংখ্যা ৬টি করে। বাকি দুই ম্যাচ ড্র।

স্পেন ২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ২০১০ বিশ্বকাপ জিতেছিল। আর্জেন্টিনা ২০২১ সালের কোপা আমেরিকাতে ট্রফি জয়ের পর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী। স্পেন ২০২৪-এর ইউরো জিতে এবার এসেছে বিশ্বকাপ জিততে। আর আর্জেন্টিনা ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এবার বিশ্বকাপ জয়ের জন্য প্রস্তুত। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে আর্জেন্টিনা ১ নম্বরে। আর স্পেন ২-এ। সুতরাং লড়াইটা যে সেয়ানে-সেয়ানে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আর্জেন্টিনার আছেন মেসি। ৮ গোল করে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে। মেসির সাথে লাউতারো মার্টিনেজ ৩ গোল করেছেন। এনজো ফার্ন্দান্দেজের দুই গোল। রয়েছেন জুলিয়ান আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, ক্রিশ্চিায়ানো রোমেরোরা। তাদের একটি করে গোল।

স্পেনেরে ভান্ডারে ৫ গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল, সুপার সাব খ্যাত মিকেল মেনেইরো (২ গোল) পেদ্রো পোরোর (২ গোল)। আর তাদের পেছনে থেকে ম্যাচটি পরিচালনার জন্য টিনএজ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালতো আছেনই। এবার তিনি একটি মাত্র গোল করলেও মাঠে বিপক্ষ ডিফেন্স লাইনে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক।