সিলেটে সাংবাদিক তুরাবের দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী আজ
এসএমপি-পিবিআই পেরিয়ে আইসিটিতে তদন্ত, বিচার নিয়ে শঙ্কায় পরিবার
Printed Edition
এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো
ক্যালেন্ডারের পাতায় ফের ফিরে এসেছে সেই রক্তঝরা ১৯ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হওয়া দৈনিক নয়া দিগন্তের তৎকালীন সিলেট ব্যুরো প্রধান, শহীদ সাংবাদিক এ টি এম তুরাবের আজ দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী। ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে এই দুই বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতার মসনদে বসেছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার, যার মেয়াদও ইতোমধ্যে ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে। তবে রাষ্ট্রের এত পরিবর্তনের মধ্যেও স্থবির হয়ে আছে সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আলোরমুখ দেখেনি মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র)। এই দীর্ঘ সময়ে মামলার প্রাপ্তি বলতে কেবল দুই আসামির গ্রেফতার আর দফায় দফায় তদন্তের বেড়াজাল।
প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা আর প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল- এমন অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসের এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। দফায় দফায় তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন আর কালক্ষেপণের কারণে নিহতের পরিবার ও সিলেটের সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও চরম হতাশা বিরাজ করছে।
সেদিন যা ঘটেছিল
দিনটি ছিল শুক্রবার, ১৯ জুলাই। জুমার নামাজ শেষে নগরের বন্দরবাজার এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে একটি মিছিল বের করে বিএনপি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মিছিলের শুরুতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ছিল। অন্যান্য দিনের মতোই সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালনে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকরা। পাশেই অবস্থান ছিল সশস্ত্র পুলিশের।
হঠাৎ করেই তৎকালীন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সহকারী কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীরের মারমুখী আচরণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সেই অতর্কিত ‘কিলিং মিশনের’ সরাসরি টার্গেটে পরিণত হন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। পুলিশের ছোড়া ৯৮টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয় তার শরীরে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই সাহসী সাংবাদিক।
তুরাবের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন প্রধান ডা: শামসুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, তুরাবের শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির ক্ষত ছিল। গুলিগুলো তার লিভার ও ফুসফুসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ছাড়া মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা তার মৃত্যুর মূল কারণ।
বিদ্ধ বুক, ভাঙা স্বপ্ন ও স্বজনদের আর্তনাদ
হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিন মাস আগে এক যুক্তরাজ্যপ্রবাসীর (লন্ডনি কইন্যা) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তুরাব। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সব প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন ছিল। কিন্তু একটি বুলেট তার জীবনের সব স্বপ্ন ও সাজানো সংসার মুহূর্তেই ধুলিসাৎ করে দেয়। বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় বিধবা হন তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তানিয়া ইসলাম। ঘটনার সময় দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় স্বামীর লাশ কিংবা শেষ বিদায়ের দৃশ্যটি পর্যন্ত দেখতে পাননি তিনি। আজ দূর পরবাসে বসেই প্রতিনিয়ত চোখের জল ফেলছেন তানিয়া।
এদিকে, মৃত্যুর আগে সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে চান শহীদ তুরাবের অশীতিপর মা। অশ্রুভেজা চোখে তিনি বলেন, ‘তুরাব ছিল আমার নাড়িছেঁড়া ধন। এই দুই বছরের একটি মুহূর্তের জন্যও আমি আমার ছেলেকে ভুলতে পারিনি। যারা আমার বুক খালি করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে পারলে আমার তুরাবের আত্মা শান্তি পাবে।’
বিচারপ্রক্রিয়া : কত দূর?
তুরাবের মৃত্যুর পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ জুলাই তার বড় ভাই আবুল আহসান মো: আজরফ (জাবুর) কোতোয়ালি মডেল থানায় ৮-১০ জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে একটি এজাহার জমা দেন। তবে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করে পার পাওয়ার চেষ্টা করে।
পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতনের পর, ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুনরায় মামলা দায়ের করেন তুরাবের ভাই। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ এবং ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। আদালত শুনানি শেষে এটিকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন।
মামলার প্রধান আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- এসএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো: আজবাহার আলী শেখ, অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো: সাদেক কাউসার দস্তগীর, কোতোয়ালি থানার সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান, বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী এবং ওয়ান ইলেভেনের আলোচিত যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলররা।
পিবিআই থেকে আইসিটি : ধীরগতির তদন্ত
মামলাটি প্রথমে কোতোয়ালি থানা ও পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তীতে গত বছর মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) স্থানান্তর করা হয়। আইসিটির তদন্ত দল দফায় দফায় সিলেট সফর করে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে।
গত বছরের ২০ জুলাই মামলার অন্যতম দুই আসামি- সাদেক কাউসার দস্তগীর ও কনস্টেবল উজ্জ্বল সিংহকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে রিমান্ডে নেয়া হয়। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছিলেন যে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চার্জশিট দেয়া হবে। কিন্তু এরপর আরো একটি বছর কেটে গেলেও চার্জশিট আলোরমুখ দেখেনি।
সর্বশেষ গত বুধবার (১৫ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি তদন্ত দল পুনরায় সিলেট সফর করে মামলার বাদি ও সাক্ষীদের সাথে কথা বলেছেন। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, তারা তদন্তের স্বার্থেই সিলেট সফর করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছেন। তবে তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে মামলার বাদি ও তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে আমার ভাইকে গুলি করে মারা হলো। ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর কোনো অভাব নেই। অথচ তদন্তের নামে এভাবে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মাত্র দু’জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বাকি মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই ধীরগতি আমাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কিত করে তুলছে।’