বরিশালে ১১ দলের সমাবেশে ডা: শফিক
ম্যাকানিজমে ক্ষমতায় গিয়ে তারা গণভোটের রায় ভুলে গেছেন
Printed Edition
বরিশাল ব্যুরো
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা নতুন শাসনব্যবস্থা চাই, গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন চাই। ম্যাকানিজম করে ক্ষমতায় গিয়ে তারা গণভোটের রায় ভুলে গেছেন। সংসদে একজন অবৈতনিক শিক্ষক আছেন, যিনি সংসদে প্রায়ই সংবিধান শেখান। প্রতারণা করলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকুন। আপনারা ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন, এটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
গতকাল শনিবার বেলা ২টায় বরিশাল নগরীর কেন্দ্রীয় হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ মাঠে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, ফরিদপুরের ভাঙ্গার পরে পুরো রাস্তা ভাঙ্গা, ভোলাবাসীর ন্যায্য দাবি ব্রিজ দিতে হবে, রেললাইন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অধিকার। বরিশালকে বঞ্চিত রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন হবে না। যেখানেই বৈষম্য সেখানেই আমরা আওয়াজ তুলবো। তিনি বলেন, আমরা আবার গর্জে উঠব, অধিকার আদায় করেই ছাড়ব। ভুল পথ থেকে ফিরে আসুন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন। ২৫ জুলাই সিলেটে সমাবেশের আগেই গণভোটের রায় মেনে নিন, নচেৎ ঢাকায় মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকুন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের সাথে আর কত ধোকাবাজি করবেন, প্রয়োজনে নতুন বাংলাদেশ গড়ব। জুলাই আন্দোলনে অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে তবুও মাথা নত করেনি। আসল ফ্যাসিবাদকে যখন জনগণ পাত্তা দেয়নি, ডামি ফ্যাসিবাদকেও দিবে না। জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য তারা চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের সাফ কথা- যেখানে জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে, সেটা যদি না মানেন তাহলে আপনাদের সরকার হিসেবে মানা হবে না।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা রাজপথে থাকতে চাই না। আমরা সবাই একসাথে কাজ করতে চাই। আমরা রক্তে আগুন লাগাতে চাই না। আর পরীক্ষা নিবেন না। আমাদের সন্তানরা পরীক্ষিত। ২৪-এর ঐতিহ্যের কথা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। জনগণের রায়ের ভোটে আপনারা সম্মান প্রদর্শন করুন। বৈষম্য আমরা মেনে নিবো না। সময় থাকতে ভালো হয়ে যান। তেলের দাম, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সকল কিছুর দাম বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়িয়ে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছেন। হাতে চিঁড়ামুড়ি নিয়ে আবার লড়াই করতে হবে অধিকার আদায়ের জন্য।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি, নিয়োগবাণিজ্য চলছে। যারা নির্বাচনের আগে ওয়াদা দেন একরকম আর কাজ করেন ভিন্ন তারাই মুনাফিক। বরিশালের উন্নয়নে সংসদে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরায় বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের প্রতি বরিশালবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। তিনি বলেন, আজকে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আপনারা সমাবেশে হাজির হয়েছেন। মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সকল রাস্তা লোকে টইটুম্বুর। দেশবাসীর প্রত্যাশা এই দেশে আর ফ্যাসিস্ট চাঁদাবাজ সৃষ্টি হবে না। আমরা ভোলা-বরিশাল সেতু চাই, ছয় লেন সড়ক চাই, গ্যাস লাইন চাই। এসব দাবি পূরণ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখে মধু, অন্তরে ছলনা। তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট চেয়েছেন আর এখন উল্টে গেছেন। ৫ আগস্টের পর তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে চলে গেছেন। এখন তারা ৩১ দফার কথা বলেন না, তারা সংস্কারের কথা অস্বীকার করে এখন সংশোধনের কথা বলছেন। ৩১ দফার প্রথম দফাই ছিল সংস্কার, আর এখন তারা বলছেন উল্টো কথা। তাই প্রধানমন্ত্রীকে বলছি- নাটক কম করেন পিও। সাধারণ মানুষের কোনো কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি বরং দলীয় কর্মীদের চাঁদাবাজি নিশ্চিত হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা শেখ হাসিনার বিচারসহ সুশাসন নিশ্চিত করব। নাহিদ বলেন, বিএনপি কখনই গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল না। তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করছে। আমরা প্রয়োজনে আবার নির্বাচনের দাবি উঠাব।
এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব:) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আওয়ামী লীগের ফেরার কোনো সুযোগ নেই, তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যে আমরা কান দেবো না। আমরা চাই এ দেশ থেকে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাস্তানি বন্ধ হোক। কিন্তু বিএনপি এসব শুনছে না, তারা আওয়ামী লীগের পতন থেকে শিক্ষা নেয়নি।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, আওয়ামী লীগের গুন্ডারা বিএনপির সাথে আর্থিক লেনদেন ও পৃষ্ঠপোষকতায় ফেরার পাঁয়তারা করছে। এই অপচেষ্টা সফল হতে দিবো না।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বাকশাল ও ভারতীয় অধিপত্যবাদ থেকে বাঁচার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছিলাম। ৫ আগস্টের পর তারা চাঁদাবাজিতে নতুনত্ব এনেছে, আর ক্ষমতায় যাওয়ার পর গুম কমিশনকেই গুম করে ফেলেছে। বিএনপি আওয়ামীলীগের মতোই সব অপকর্ম করে যাচ্ছে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, যারা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চাপ দিয়ে চাঁদা দাবি করে তাদের কাছে উন্নয়ন দাবি করে কোনো লাভ নেই। যারা কথায় কথায় মিথ্যা কথা বলে, যারা জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি করে তাদের সাথে কোনো আপস নেই, মুনাফিকদের সাথে আপস নেই।
এনসিপির যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক ডা: মাহমুদা আলম মিতু এমপি বলেন, সংস্কার করলে চাঁদাবাজি করা যাবে না, তাই তারা এখন সংস্কারের কথা ভুলে গেছেন। খালেদা জিয়া বলে গেছেন, আওয়ামী লীগের সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে, অথচ বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের সংবিধান আগলে রাখতে চাইছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, বিচার ও সংস্কারকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্য তারা ফ্যাসিবাদীদের মতো উন্নয়নের ধোয়া তুলছে।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান, ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নাল আবেদীন, বরিশাল জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবদুল জব্বার, বিএম কলেজের সাবেক এ জি এস শেখ নেয়ামুল করিম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, বরিশাল অঞ্চল জামায়াতের টিম সদস্য ফখরুদ্দিন খান রাজী।
সমাবেশ শুরুর আগে সকাল থেকেই বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে হাজির হন। দুপুরের আগেই সমাবেশস্থল কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সকাল ১০টা থেকে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে উদ্দীপনামূলক কোরাস সঙ্গীত পরিবেশন করেন দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ বরিশাল অঞ্চলের আওতাধীন ছয় জেলা ও মহানগর শাখার শিল্পীরা।
‘দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো জামায়াতের প্রতিটি কর্মীর নৈতিক দায়িত্ব’
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, সড়কপথে বরিশালের সমাবেশে যাওয়ার পথে ডা: শফিকুর রহমানকে মাদারীপুর-৩ (কালকিনি-ডাসার) আসনের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন। গতকাল সকালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কালকিনি উপজেলার ভূরঘাটা এলাকায় এক সংক্ষিপ্ত পথসভায় জামায়াত আমির বলেছেন, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের কল্যাণে আমাদের কাজ করতে হবে। যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত সহযোগিতা পৌঁছে দেয়া জামায়াতের প্রত্যেক কর্মীর নৈতিক দায়িত্ব। পথসভায় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা ডা: শফিকুর রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, কালকিনি উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা এনামুল হক, কালকিনি পৌর জামায়াতের আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম এবং ডাসার উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুস সালাম। এ ছাড়াও কালকিনি পৌর মেয়র পদপ্রার্থী হাসান জামান খান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাওলানা জাকির হোসেন মোল্লা, পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলামসহ কালকিনি ও ডাসার উপজেলা এবং পৌর জামায়াতের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা পথসভায় উপস্থিত হন।