রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান

দেশের বিভিন্ন স্থানে হামে আক্রান্ত আরো শিশুর মৃত্যু

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান (ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত, প্রথমে সেখানে টিকা দেয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন এ ঘোষণা দিয়েছেন।

মন্ত্রী বলেন, টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে আগামীকাল (আজ) বৃহস্পতিবার এবং পরশু শুক্রবারের মধ্যে উপজেলাপর্যায়ে পাঠিয়ে দেয়া হবে। রোববার সকাল থেকে টিকাদান শুরু করা হবে। তিনি বলেন, আমরা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ রোববার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) থেকে প্রত্যাহার করেছি, কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই স্থানীয় কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।’ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যতটা ভয়াবহভাবে হাম আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছি। কিছু মৃত্যু হয়েছে। তবে অবশ্যই বলব, আমরা এটি যথাযথভাবে ম্যানেজ করেছি। আমরা দ্রুতগতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করেছি, যেটা খুবই দরকার ছিল। শিশুরা যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায় সে জন্য বিভিন্ন জায়গায় ভেন্টিলেটর দিয়েছি। সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন আরো বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসের হামের একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল। সবাইকে তখন এর আওতায় আনা হয়নি, অসম্পূর্ণ অবস্থায় ওই ক্যাম্পেইন শেষ করা হয়েছে।

টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক সংগঠন গ্যাভির (জিএভিআই) কাছে ২১.৯ মিলিয়ন (দুই কোটি ১৯ লাখ) হামের টিকার মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এই টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। টিকা কেনা হলে গ্যাভির কাছ থেকে নেয়া টিকা রিপ্লেস (ফেরত) করা হবে। আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই টিকা পেলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোররা এই টিকা নিতে পারবে বলেও জানান মন্ত্রী।

এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দীন হায়দার।

চট্টগ্রামে ১ শিশুর মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, চট্টগ্রামে হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক শিশু মারা গেছে। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, সন্দেহজনক হাম রোগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক শিশু মারা গেছেন। মৃত শিশুটির স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার জেলায়। তিনি জানান, মহানগর ও উপজেলাগুলো মিলিয়ে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে আটজন শিশুর শরীরে হাম রোগ শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১১ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে হাম পরীক্ষা করার জন্য। এর মধ্যে গতকাল ২০ জন শিশুর নমুনা পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান। বুধবার সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘরে ঘরে শিশুদের জ্বরের খবর পাওয়া গেলেও সবগুলো হাম রোগে আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত; হামের নমুনা পরীক্ষার একমাত্র পরীক্ষাগার ঢাকায় অবস্থিত। ফলে নমুনা পরীক্ষা ফলাফল দ্রুত পাওয়ার সুযোগ নেই।

বগুড়ায়এক শিশুর মৃৃত্যু : আক্রান্ত অর্ধশতাধিক

বগুড়া অফিস জানান, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে হামে উপসর্গ নিয়ে হুমায়রা নামে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালের হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অর্ধশতাধিক হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় শজিমেক হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা একটি আইসোলেশন বিভাগ খোলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে ১০টি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ১৮টি শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা হলেও কারো শরীরে হামের অস্তিত্ব (পজিটিভ) পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ২১ শিশু

ময়মনসিংহ অফিস জানান, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা এবং তাদের অধিকাংশেরই এখনো টিকা নেয়ার বয়স হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এই ২১ শিশুকে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা চলছে।

চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ১৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৪ শিশু, অন্যদের চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।

চিকিৎসকদের তথ্যমতে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় একটি অংশ ময়মনসিংহ জেলার। শনাক্ত হওয়া হামের রোগীদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই এই জেলার বাসিন্দা। একই সাথে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যেও প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার।

বিশেষ করে সদর ও নগর এলাকায় আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসপাতালে চাপ, আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু

হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালের আটতলায় ৬৪ শয্যার একটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ দিয়ে পানি পড়া ও শরীরে র‌্যাশ নিয়ে ভর্তি রয়েছে। অনেক শিশুকে অক্সিজেন ও নেবুলাইজার সহায়তা দিতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশই ৯ মাসের নিচে বয়সী। তাদের টিকা নেয়ার সময় হয়নি। বাকি শিশুদের মধ্যে অল্পসংখ্যক এক বা দুই ডোজ টিকা পেয়েছে।

বরিশাল বিভাগে ভর্তি ২৬৪ শিশু

বরিশাল ব্যুরো জানান, সারা দেশের মতো বরিশালেও দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে আটজন শিশু মারা গেছে।

এর মধ্যে বরগুনায় তিনজন, বরিশালে একজন, ভোলায় দু’জন ও ঝালকাঠিতে দু’জন ।

বিভাগে এখন পর্যন্ত ২৬৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন এর মধ্যে ২২৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের শিশু বিভাগে ১ এপ্রিল বুধবার হাম ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ২৩ জন শিশু। হাম রোগ নিয়ে মোট ৫২ শিশু ভর্তি রয়েছে ওয়ার্ডটিতে।

এই হাসপাতালে তিনটি আলাদা আইসোলেশন রুম করা হয়েছে। তবে একটি বেডে তিন থেকে চারজন শিশুকে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত স্থান ও বেড না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা।

ছোঁয়াচে এই রোগে স্বজনরাও রয়েছেন অনেকটা আতঙ্কে। ঠাসাঠাসি করে এভাবে রাখার কারণে অন্যান্য রোগীও আতঙ্কে রয়েছে ওয়ার্ডটিতে।

বিভাগের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র শের ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সুযোগ সুবিধা এবং আইসিইউর কেয়ারের ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা সেবা দিতে অনেকটাই অসুবিধা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিশু বিভাগের প্রধান ডা: বিকাশ চন্দ্র নাগ।

এ দিকে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডাক্তার শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানিয়েছেন, হাম প্রতিরোধে এবং এর চিকিৎসায় বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।