একজন আদর্শ শিক্ষক

Printed Edition

নূরুল হক

নাসরিন সুলতানা একজন নিভৃতচারী মানুষ। কর্মজীবনে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়েছেন। বিএসসি অনার্স ও এমএসসি পাস করে প্রায় ৩৩ বছর বয়সে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি মনে করেন, চেষ্টা করে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়া যায়। প্রকৃত অর্থে শিক্ষক হতে হলে সাধনা করতে হয়। এই সাধনা কোনো দিন শেষ হয় না। সাগরদী পিটিআই, বরিশাল থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, বরিশাল থেকে বিএড এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড সম্পন্ন করে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশ বছর ধরে সাধনা করে যাচ্ছেন। নাসরিন সুলতানার জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৭২। পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার পশ্চিম মিঠাখালি গ্রামে কেটেছে তার শৈশবের বিরাট একটা সময়। ১৪ বছর বয়স থেকে বরিশালে আছেন। তার পরিবার ছিল জ্ঞান ও নৈতিকতার পাঠশালা। পিতা মো: ইসমাইল হাওলাদার ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী, বড়মাছুয়া বাজারে তার ছিল বড় দোকান। সবাই তাকে চিনতেন সাহসী, সত্যবাদী ও পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে। তার মা ছিলেন একজন মহীয়সী নারী, স্নেহ, ধৈর্য ও সুশিক্ষার প্রতিমূর্তি। দশ ভাইবোনের সেই পরিবারে মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার পাঠ পেয়েই নাসরিনের জীবনবোধ গড়ে ওঠে।

ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য রচনা করতেন। স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে। বইও আছে ২০টি। বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন কেন্দ্র তার লেখা থেকে নাটক বানিয়ে প্রচার করে। জীবনে কোনো দিন গান বা ছবি আঁকা শেখেননি। অথচ শিশুদেরকে তিনি গান শেখান; ছবি আঁকা শেখান। নিয়মিত গান বা ছবি আঁকার পাঠ পরিচালনা করেন না;কিন্তু শিশুরা যখন জগের পানি, চোখের পানি বা পুকুরের পানির রঙ নীল দেয় তখন তিনি হয়ে ওঠেন ছবি আঁকা শেখানোর শিক্ষক। সব পানির রঙ নীল হবে না, পানির কোনো রঙ নেই এ ধরনের কথা শিশুরা তার কাছ থেকেই শেখে। তিনি নিজেও ছবি আঁকেন। তার ‘টুশিদের কাহিনি’ বইয়ের প্রচ্ছদে তিনি তিনজন নারীর ছবি এঁকেছেন যা দেখলে মনে হয় ছবির কাজ করলেও তিনি ভালো করতেন। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য শিশুদের জন্য লেখা স্তরভিত্তিক বইসমূহ- শখ, শখের শখ, শখের কাজ, শখের আশা, শখের প্রতিজ্ঞা, শখের সাফল্য, শখের দাদার স্বাধীনতা দিবস, শপথ, টুশিদের কাহিনি, আমরা সবাই বন্ধু, পরির মতো মুখ। প্রতিটি বই যেন একেকটি জ্ঞানবীজ, যা শিশুর মনে আলো জ্বালায়। এর মধ্যে শখের শখ ও শখের কাজ দৃষ্টিজয়ী শিশুদের জন্য ব্রেইল সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে- যা মানবিক সাহিত্যচর্চার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নাসরিন সুলতানা শুধু লেখেন না, তিনি শিশুদের মধ্যে লেখার আগ্রহও সৃষ্টি করেন। তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে গল্প, কবিতা, অনুচ্ছেদ ও ছবি আঁকানোর পর তিনি সেগুলো জাতীয় দৈনিকে পাঠান। শিশুরা যখন নিজেদের নাম ও কাজ পত্রিকায় দেখে, তাদের চোখে আনন্দের দীপ্তি জ্বলে ওঠে। এই অনন্য উদ্যোগের নাম তিনি দিয়েছেন Little Celebrity. শিশুদেরকে তিনি বলেন, ‘পৃথিবী থেকে চলে গেলেও তোমাদের কাজের ফল যেন অন্যরা ভোগ করতে পারে।’ কর্মে, চিন্তায় ও সৃষ্টিতে তিনি এক অবিচল দীপশিখা- যিনি শুধু শিশুদের পড়ান না, বরং শেখান কেমন করে ভালো মানুষ হতে হয়। তার জীবন এক অনুপ্রেরণার গল্প- যেখানে আছে শিক্ষার তপস্যা, লেখার দীপ্তি এবং মমতার নিরন্তর প্রবাহ। তিনি যেন এক নীরব আলোকবাহিকা- যিনি নিজের হাতে শিশুদের মনোভূমিতে জ্ঞানের বীজ বপণ করেন, আর অপেক্ষা করেন একদিন সেই বীজ ফুল হয়ে ফুটবে মানবতার বাগানে।