মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে আরাকান আর্মির মাইন : এক বছরে ২৪টি বিস্ফোরণ
Printed Edition
কক্সবাজার অফিস
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে আরকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০২৫ সালে অন্তত ২৪টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিস্ফোরণে ঠিক কতজনের প্রাণহানি ঘটেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও সংখ্যাটি একেবারে কম নয় বলে জানিয়েছেন সূত্রটি। আহতের সংখ্যাও অনেক। নিহতের সবাই মিয়ানমারের নাগরিক। হাতিসহ বন্যপ্রাণী হতাহতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে এখন বাংলাদেশী বাসিন্দাদের ল্যান্ডমাইন আতঙ্কে পার করতে হচ্ছে দিনরাত। স্থানীয় কৃষকরা চাষাবাদ, গবাদিপশু চারণসহ দৈনন্দিন কাজ করছেন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর আলীকদম সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন মিয়ানমারের একজন নাগরিক। আহত হয়েছেন এক বাংলাদেশীও। নিহত মেনথাং ম্রো (৪০) এবং আহত মাংছার ম্রো (৩০) তারা উভয়েই ৫৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের পশ্চিম পাশ দিয়ে মগপাড়া এলাকায় জুম দেখার জন্য যাচ্ছিলেন। পথে মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মেনথাং ম্রো মারা যান। তিনি মিয়ানমারের নতুনপাড়ার বাসিন্দা। আহত মাংছার ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের গর্জনপাড়া এলাকায়। এর একদিন আগে, ১৩ অক্টোবর নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে একজন বিজিবি সদস্য আহত হন। গুরুতর আহতবস্থায় তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। পাহাড়ে জুম চাষ করতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো নাইক্ষ্যংছড়ির মালাই তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, জুম কাটতে কাটতে পায়ের নিচে একটা মাইন পড়ে গেছে, আমি নিজেও বলতে পারি না। হঠাৎ বিস্ফোরণে আমার পা উড়ে যায়। এরপর থেকে এক পায়ে ভর করে চলছি আমি। নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলার আশারতলী, সোনাইছড়ি, ঘুনধুমের বাইশফাঁড়ি, তুমব্রুসহ একাধিক এলাকায় গত বছর ২৪টির মতো মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত সোমবার টেকনাফের হোয়াইক্যাং সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ (২৮) নামের এক যুবকের বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তিনি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লম্বাবিল গ্রামের ফজল করিমের ছেলে। স্থানীয় সূত্রমতে, হোয়াইক্যং সীমান্তের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি চিংড়িঘেরে চাকরি করেন হানিফ।
হোয়াইক্ষ্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। গত রোববার নাফ নদ তীরের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে গুলি বিনিময়ের স্থানেই মাইনটির বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় ওই যুবকের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন সীমান্তের মানুষ চরম আতঙ্কে সময় পার করছেন। উখিয়ায় দায়িত্বরত ৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের কাছাকাছি কিছু এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। কোন কোন স্থানে এসব মাইন রয়েছে, তা শনাক্তে কাজ চলছে।
বাংলাদেশ পুনর্বাসন কেন্দ্র ফর ট্রমা ভিকটিমসের (বিএরসিটি) কর্মকর্তা জানান, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে মাইন বিস্ফোরণে অসংখ্য বন্যপ্রাণী হতাহতের ঘটনা ঘটছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। তিনি আরো বলেন, আমরা সীমান্তে সাধারণভাবে ট্রমা ও ক্ষতের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা, মানসিক সমর্থন ও সামাজিক সংযুক্তি কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বর্তমানে মাইন বিস্ফোরণে আহতদের পাচ্ছি যারা জীবনের তরে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এনজিও সংস্থা এমএসএফ-এর একজন সুপারভাইজার জানান, মাইন বিস্ফোরণে আহতদের উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা সীমান্ত এলাকায় নেই। ঘুনধুম সীমান্তের বাসিন্দা মাস্টার খাইরুল বাশার জানান, প্রতি রাতেই বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। সীমান্তে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে রোহিঙ্গারা হতাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এলাকায়। মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে পুঁতা হয়েছে অসংখ্য মাইন। জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলাকায় বাংলাদেশী বাসিন্দাদের চাষাবাদ এবং গবাদিপশুর চারণভূমি থাকায় প্রতিনিয়ত কৃষকরাই মাইন বিস্ফোরণে হচ্ছেন পঙ্গু, হারাচ্ছেন প্রাণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে মাইন বসানো আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। মাইন পুঁতে রাখলে এগুলো চিহ্নিত করতে হবে, তা না হলে এটি হবে অমানবিক, আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনের আশ্রয় নেয়া। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি কোনো মাইন বসায়নি। সীমান্তের ওপারে যাতে কোন বাসিন্দা না যায়, সেজন্য আমরা টহল কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসচেতনতা কার্যক্রমও চালাচ্ছি।