রাজনৈতিক দলগুলোর তোপের মুখে ছিল ইসি

সালতামামি

Printed Edition

হামিদুল ইসলাম সরকার

  • ১০ লাখ প্রবাসীকে ভোটের আওতায় আনা বড় কাজ-জেসমিন টুলি

  • জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রারম্ভিক প্রস্তুতির বছর ছিল- ড. আবদুল আলীম

জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও), নির্বাচনী আইন, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল এসব বিষয় নিয়ে চরম চাপের মুখে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত এ এম এম নাসিরউদ্দিন কমিশন। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলো চাপ সৃষ্টি, বিপরীতে বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলোর জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে চাপ। অন্য দিকে এনসিপির নিবন্ধন ও তাদের শাপলা ফুল প্রতীক হিসেবে চাওয়া নিয়ে দীর্ঘ একটা সময় চাপের মধ্যে ছিল। গণভোটের আয়োজনের দায়িত্ব আসায় এখন দু’টি ভোট একদিনে করা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং গণভোট সম্পন্ন করাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ইসির সামনে। বিশ্লেকরা বলছেন, ১০ লাখ প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান বড় অর্জন। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজদের প্রস্তুতির বছর ছিল।

জুলাই ২০২৪-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে এই বছরটি মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের বছর হিসেবে চিহ্নিত। তারা গত ২৮ আগস্ট ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৪ দফা সংবলিত রোডম্যাপ বা ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করে। ১১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন। ভোটার তালিকা ও নিবন্ধন কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেন। কমিশন ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ২১ লাখ মৃত ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে এবং ৪৪ লাখ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নিবন্ধন ফিরিয়ে দিয়েছে।

প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট : বড় কাজ করেছে প্রবাসী ভোটারদের প্রথমবারের মতো বিপুল সংখ্যক প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। প্রায় ১১ লাখ প্রবাসী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এটাই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসীদের জন্য ‘পোস্টাল ব্যালট’ বা ডাকযোগে ভোটের নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা।

সংলাপ আয়োজন : অংশীজনদের সাথে দুদফা আনুষ্ঠানিক সংলাপ করেছেন ইসি। সেপ্টেম্বর থেকে ইসি সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নিবন্ধিত ৪৭টি রাজনৈতিক দলের সাথে ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজন করে।

আইন ও নীতিমালা সংশোধন : গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ এর বেশ কিছু আনুচ্ছেদ ও ধারায় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে জোটবদ্ধ নির্বাচনে নিজের দলীয় প্রতীকেই নির্বাচন করতে হবে। পোস্টার ব্যবহার তুলে দেয়া। আদালত কর্তৃক পলাতক ঘোষিত ব্যক্তি নির্বাচন করতে পারবে না। জামানত ২০ হাজার টাকার জায়গায় বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করেছে। আওয়ামী সরকারের আমলে নেয়া ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার বাতিল করেছে। সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী কেন্দ্র এমনকি পুরো আসনের নির্বাচনকে বাতিল করার ক্ষমতা এখন ইসির হাতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক নীতিমালা-২০২৩’ রহিত করে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এ ছাড়া ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়।

নতুন দলের নিবন্ধন : ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)সহ তিনটি নতুন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন প্রদান করে ইসি।

মাঠ প্রশাসনের সাথে বৈঠক : ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে দেশের সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপারদের (এসপি) নিয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্লেষকরা যা বললেন : সাবেক নির্বাচন সংস্কার ও ইনকোয়ারি কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আবদুল আলীম ইসির বিশ্লেষণ নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য স্টার্টিং পয়েন্ট। যেটা করেছে ছিল, ইলেকশন কমিশনের প্রস্তুতির বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের জন্য। ইলেকশন কমিশন নানা রকম প্রস্তুতি যেগুলো দরকার হয় অর্থাৎ নির্বাচনকালে যে কাজগুলো করতে হয় পলিটিক্যাল পার্টির নিবন্ধন, নির্বাচন এলাকার সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা সেগুলো করেছে। পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন দিয়েছে। অন্যান্য যে লজিস্টিক্যাল প্রস্তুতি সেই প্রস্তুতিগুলো তারা নিয়েছে। যদিও ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, তারপরেও উদ্যোগগুলো আমার কাছে মনে হয় ঠিক আছে, ভালো ছিল। আমাদেরকে এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে এমন একটা নির্বাচন করতে হবে যাতে করে আগামী নির্বাচন যেগুলো হবে সেগুলোর ভিত্তিটা এখান থেকে শুরু হয় এবং সমস্ত নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়, অবাধ এবং সুষ্ঠু হয়।

বতর্মান নির্বাচন কমিশনের কাজের পর্যালোচনায় ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সংস্কার কমিশনের দেয়া সুপারিশের আলোকে ইসি বেশি কিছু সংস্কার করেছেন। তবে তাদের গত বছরের মূল্যায়ন করতে হলে বলতে হয়, তারা তো গত বছর কোনো নির্বাচন করেননি। কোনো নির্বাচন সম্পন্ন করলে হয়তো সেখানে কাজের মূল্যায়ন করা যেত। তাই কাজের মূল্যায়ন করা যাবে না।

কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের দেয়া সুপারিশের আলোকে কিছু আইন তারা সংস্কার করেছেন। সীমানা নির্ধারণের কাজটা করেছিলেন। কিন্তু আদালতের কারণে তাদেরকে পুরনো অবস্থায় ফিরতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ১০ লাখ প্রবাসী ভোটারকে আগামী নির্বাচনে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা। এটা অনেকেই করতে চেয়েছিল; কিন্তু বাস্তবায়নে যেতে পারেনি। এই কমিশন সেটা করতে পেয়েছে। যা অবশ্যই বড় অর্জন।

জেসমিন টুলি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় সংস্কারের মধ্যে পোস্টারের ব্যবহারকে তুলে দেয়া একটা বড় কাজ। এটায় পরিবেশ পরিচ্ছন্ন এবং পোস্টার লাগানো নিয়ে যে একটা বিবাদ ও সংঘর্ষ হয় তা বন্ধ হবে।