সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান

করিডোর নিয়ে চীনের প্রস্তাবে বিলম্ব আমাদের ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
first-4
করিডোর নিয়ে চীনের প্রস্তাবে বিলম্ব আমাদের ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে নানা সমীকরণ। এই পরিস্থিতিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরাসরি সংযোগ ও বিনিয়োগের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের কৌশলগত বার্তা বহন করে? ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎই বা কী?

এসব জটিল ও স্পর্শকাতর ভূ-কৌশলগত বিষয়ে ‘নয়া দিগন্ত’-এর সাথে এক দীর্ঘ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ও প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান। তার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার চুলচেরা বিশ্লেষণের আলোকে সাক্ষাৎকারটির বিস্তারিত রূপ নিচে উপস্থাপন করা হলো :

নয়া দিগন্ত : চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক প্রস্তাবটিকে আপনি সামগ্রিকভাবে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ড. এম শাহীদুজ্জামান : আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাষ্ট্রাচারের একটি মৌলিক নিয়ম আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট যখন নিজে সরাসরি কোনো দেশের অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন, তখন তা আর সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক আলোচনা থাকে না। এটি বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নীতি, সক্ষমতা এবং সার্বভৌম গ্যারান্টির সরাসরি বহিঃপ্রকাশ। শি জিনপিং কেবল চীনের প্রেসিডেন্ট নন, তিনি দেশটির একজন অনবদ্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একচ্ছত্র নেতা। তার মুখ থেকে আসা যেকোনো প্রতিশ্রুতির অর্থ হলো- তাতে চীনের সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় শক্তি ও অর্থায়নের শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে।

আমি মনে করি, চীনের প্রেসিডেন্ট যখন স্বয়ং চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে যুক্ত করে এই ঐতিহাসিক করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব দিলেন, তখন বেইজিংয়ের এই সর্বোচ্চ সম্মান ও সদিচ্ছার জবাবে কালক্ষেপণ না করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তাৎক্ষণিকভাবে তাতে সম্মতি দেয়া উচিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে কোনো ধরনের দ্বিধা, সঙ্কোচ বা অস্বস্তি থাকা মোটেও উচিত নয়। আমাদের বলা উচিত ছিল, ‘আমরা এই দূরদর্শী প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্পূর্ণ একমত, আপনারা প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যান’।

চীন হুট করে কোনো প্রস্তাব টেবিলে আনে না। তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক নিশ্চয়ই মাঠপর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করেছে। চীন এ বিষয়ে ১০০ ভাগ নিশ্চিত যে, তারা যদি মিয়ানমারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেডলাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়, তবে এই করিডোর সংযোগ স্থাপনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার আপত্তি বা ভিন্নমত পোষণের সুযোগ থাকবে না। বেইজিং এই সমীকরণটি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করার পরই বিষয়টি শীর্ষ পর্যায় থেকে উত্থাপন করেছে। এমন একটি সুবর্ণ সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে ‘দেখছি, দেখব’ বা ‘ভেবে দেখব’ নীতি গ্রহণ করা মূলত আমাদের এক বিরাট ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’। এই বিলম্ব জাতীয় স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

নয়া দিগন্ত : আমাদের দেশের অনেক বিশ্লেষক ও কূটনীতিক মনে করছেন, চীনের এই ধরনের মেগা করিডোরে যুক্ত হলে বাংলাদেশ বৃহৎ শক্তিগুলোর (বিশেষ করে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) তীব্র ভূ-কৌশলগত চাপের মুখে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা কি অমূলক?

ড. এম শাহীদুজ্জামান : আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলব- এই ধরনের আশঙ্কা কেবল অমূলকই নয়; বরং এর পেছনে একধরনের ‘ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতা’ এবং পরনির্ভরশীল মানসিকতা কাজ করছে। আমাদের বুঝতে হবে, চীনের এই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সম্মতি প্রদান করা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য এখন অপরিহার্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং থিংকট্যাংকগুলোতে এমন কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ‘ভারতপন্থী উপাদান’ সক্রিয় রয়েছে, যারা দেশের জাতীয় অগ্রগতির চেয়ে বহিঃশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষা করতেই বেশি পছন্দ করে। তারা আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার এক কাল্পনিক ধুয়া তুলে দেশের উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থাকে এক জায়গায় স্থবির করে রাখতে চায় এবং ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তা হুমকির অজুহাত দাঁড় করায়।

আমাদের চার পাশের বাস্তবতার দিকে একটু তাকানো যাক। নেপালের মতো একটি ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র ইতোমধ্যে হিমালয়ের অত্যন্ত দুর্গম এবং উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল দিয়ে চীনের সাথে সংযোগ সড়ক ও করিডোর নির্মাণের কাজ সফলভাবে শুরু করে দিয়েছে। পরিবেশগত, ভূ-তাত্ত্বিক এবং কারিগরি দিক থেকে হিমালয়কে কেটে পথ তৈরি করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল, তা সবারই জানা। নেপাল যদি তার সীমিত সামর্থ্য আর ভারতের তীব্র চাপ উপেক্ষা করে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে এমন সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না?

ভূ-তাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এবং সমতল বা পাহাড়ি পথ দিয়ে চীনের ইউনান প্রদেশ (মান্দালয় হয়ে) পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করা নেপালের চেয়ে হাজার গুণ সহজসাধ্য। এটি আমাদের জন্য একটি নিশ্চিত লাভজনক পথ, যাকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ‘লো-হ্যাংগিং ফ্রুট’ বলা হয়। মিয়ানমারে একধরনের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত বা গৃহযুদ্ধ চলছে- এটি সত্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, দেশটির সামগ্রিক যোগাযোগ বা নাগরিক জীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে। মিয়ানমারের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলছে, তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহন সচল রয়েছে। এই যুদ্ধ নির্দিষ্ট সীমান্ত অঞ্চলের বাইরে আন্তর্জাতিক করিডোরকে থমকে দেয়ার মতো কোনো বড় উপাদান নয়। অথচ ভারতের পক্ষ থেকে এই নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতাকে অতিরিক্ত ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে, আর আমাদের দেশের কিছু মানুষ না বুঝে বা জেনেবুঝে সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে হত্যা করছে।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে একটি দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে যে, চীনের সাথে কোনো বড় করিডোর বা তিস্তা ব্যারেজের মতো মেগা প্রকল্পে বাংলাদেশ হাত দিলে ভারত রুষ্ট হবে। ফলে তারা বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি বা পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। এই ‘পানি-অস্ত্র’ মোকাবেলার কোনো পথ কি বাংলাদেশের আছে?

ড. এম শাহীদুজ্জামান : ভারত পানিকে দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত কার্যকর ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, এটি একটি অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের বছরের পর বছর ধরে চলা ‘ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা’ এবং কালক্ষেপণের কৌশল কোনো নতুন ঘটনা নয়। তারা বাংলাদেশকে তিস্তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে প্রচ্ছন্ন ভূ-রাজনৈতিক লিভারেজ বা সুবিধা ভোগ করছে; কিন্তু আমি আপনাদের এই সমীকরণের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক সত্যটি বলতে চাই : চীনের সরাসরি সম্পৃক্ততার ফলে ভারতের এই ‘পানি-অস্ত্র’ এবং প্রচ্ছন্ন হুমকিগুলো এখন চিরতরে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। ভারতের এই একমুখী চাপ এখন পাল্টা চাপের মুখে পড়তে বাধ্য।

ভূ-রাজনৈতিক টার্মসে তিস্তার পানি প্রবাহে যদি ভারত কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করে বা বৈরী আচরণ দেখায়, আর সেখানে যদি চীনের সাথে আমাদের শক্তিশালী কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চুক্তি থাকে, তবে চীনই নিশ্চিত করতে পারবে যেন বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়। এর পেছনে যে বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক লিভারেজটি কাজ করছে, তা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের খুব গভীরভাবে বুঝতে হবে।

ভারত যেমন বাংলাদেশের জন্য উজানের দেশ, তেমনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর প্রধান জীবনরেখা তথা ব্রহ্মপুত্র নদের উজানের দেশ; কিন্তু স্বয়ং চীন (তিব্বত অঞ্চলে এটি ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত)। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ভারতের জন্য একটি স্থায়ী ও চরম কৌশলগত দুর্বলতা। চীন যদি উজানের দেশ হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি প্রবাহ আংশিক ডাইভার্ট করে বা নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ভারতের আসামসহ পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এক অভাবনীয় ও মহাবিপর্যয়কর সঙ্কটের মুখোমুখি হবে।

সুতরাং, বাংলাদেশ যদি চীনের সাথে করিডোর বা তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে যায় এবং ভারত সেখানে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তবে চীনের এই ‘আপার রাইপেরিয়ান’ লিভারেজ সেই বাধাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশমিত করবে। চীন উজানের দেশ হওয়ায় তারা ভারতকে এমন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারবে, যেখানে ভারতের পক্ষে কোনো সুবিধা করা সম্ভব হবে না। চীনের এই শক্তিশালী উপস্থিতি বাংলাদেশকে ভারতের সাথে যেকোনো দরকষাকষিতে এক সুবিধাজনক ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভারতের পানি-কেন্দ্রিক হুমকিগুলো এখন অপাংক্তেয় ও অকার্যকর, যদি আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কার্ডটি খেলতে পারি।

নয়া দিগন্ত : মিয়ানমারে বর্তমান জান্তা সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে। এই অবস্থায় তাদের সাথে এই করিডোর নিয়ে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা বা দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রক্ষা করা কি বাংলাদেশের জন্য সঠিক কৌশল হবে?

ড. এম শাহীদুজ্জামান: কূটনীতি কোনো আবেগ বা নৈতিকতার ওপর চলে না; কূটনীতি চলে সম্পূর্ণ বাস্তববাদ বা রিয়ালিজমের ওপর। মিয়ানমারের সাথে সরাসরি এবং কার্যকর রাজকূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই অপরিহার্য। তবে হ্যাঁ, মিয়ানমার জান্তা যেহেতু বর্তমানে দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিরোধ ও আরাকান আর্মির মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত, তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সফরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁত ও সঠিক ‘কৌশলগত টাইমিং’ বিবেচনা করতে হবে।

নেইপিডোতে আমাদের যে হাই-কমিটি বা অভিজ্ঞ অ্যাম্বাসেডর আছেন, তারা প্রতিনিয়ত সেখানকার রাজনৈতিক ও সামরিক গতিপ্রকৃতি কূটনৈতিকভাবে যাচাই-বাছাই করছেন এবং সঠিক সময় নির্ধারণ করবেন। পরিস্থিতি এবং টাইমিং যদি অনুকূলে আসে, তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং মিয়ানমার সফর করতে পারেন এবং এই করিডোরের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে পারেন। এতে দোষের বা ভয়ের কিছু নেই।

বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চীনের নিজস্ব বৈশ্বিক ও জাতীয় স্বার্থের কারণেই মিয়ানমারের জান্তা বা ভবিষ্যৎ যেকোনো নেতৃত্ব এই করিডোর প্রকল্পে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে। আজ যদি ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক কিছুটা চাঙ্গা হয়ে থাকে, তবে তা মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাংশের নিরাপত্তা, ট্রাইবাল বিদ্রোহ দমন এবং কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রজেক্টের স্বার্থে। অনেক বছর আগেও সমুদ্রসীমান্ত নির্ধারণের প্রশ্নে ভারত ও মিয়ানমারকে একধরনের সামরিক মিত্ররূপে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারকে ব্যবহারের এই বড় সুযোগটি আমরা নেব কি না। এমনও হতে পারে যে, প্রস্তাবিত রাস্তা ও রেললাইন চীন থেকে মান্দালয় হয়ে অত্যন্ত সহজ ও সংক্ষিপ্ততম স্থলসীমান্ত দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। মিয়ানমারের ভেতরের যুদ্ধ কিন্তু কোনো প্রতিবেশী দেশের স্থল যোগাযোগ বা বাণিজ্যকে পুরোপুরি বন্ধ করে রাখেনি। ভারত যদি মিয়ানমারের বুক চিরে নিজেদের মিজোরাম রাজ্য থেকে সরাসরি থাইল্যান্ড পর্যন্ত ‘ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক’ নিয়ে যেতে পারে, তবে চীন কেন থেমে থাকবে? আর বাংলাদেশ কেন এই ট্রানজিটের কেন্দ্রীয় হাব হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে?

নয়া দিগন্ত : দেশের ভেতরের কিছু অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যদি সুশাসন, জবাবদিহিতা কিংবা শক্তিশালী দেশীয় বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকে, তবে বাইর থেকে আসা এত বড় আন্তর্জাতিক মেগা বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতি ধরে রাখতে পারবে না। একে আপনি কিভাবে দেখেন?

ড. এম শাহীদুজ্জামান : এই যুক্তিটি আসলে মূল সমস্যাকে আড়াল করার একটি চমৎকার চেষ্টা। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা বা পুঁজির সঙ্কটের আসল কারণ কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক মন্দা বা সামর্থ্যরে অভাব নয়। এর মূল কারণ হলো- বিগত বছরগুলোতে দেশি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক উচ্ছিষ্ট ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর তৈরি করা এক ভয়াবহ ‘পলায়ন সংস্কৃতি’ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সীমাহীন পুকুরচুরি। দেশের তথাকথিত অলিগার্করা সিন্ডিকেট করে এ দেশ থেকে কোটি কোটি ডলার ও টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলেই আজ দেশীয় বিনিয়োগে এই টান পড়েছে।

কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে চাই, বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনশক্তি কি এতই অকার্যকর ও পঙ্গু? মোটেও না। এই বিশাল, তরুণ ও প্রাণবন্ত জনশক্তিকে যদি আমরা সঠিক অবকাঠামো আর বৈশ্বিক যোগাযোগের সাথে যুক্ত করে দিতে পারি, তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের চেহারা বদলে যেতে বাধ্য।

সময় এসেছে, চীনের এই ভূ-কৌশলগত ও উচ্চতর অর্থনৈতিক রূপরেখায় বাংলাদেশের নতুন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা এবং সাহসের সাথে সিদ্ধান্ত নেয়া। আমি আমার দীর্ঘ চার দশকের অধ্যাপনা জীবন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর আলো থেকেই অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে এই কথাগুলো বলছি। আমাদের জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর ওপরে স্থান দিতে হবে। আমি আশা করি, আমাদের দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল বা নির্দিষ্ট বলয়ের বিশ্লেষকেরা উজ্জ্বল হাসিমুখে নিজের দেশের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির যূপকাষ্ঠে ‘গিলোটিন’ বা বলি দিতে আর উৎসাহী হবেন না। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের একমুখী ও সাহসী হতেই হবে।