শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালে থাকছে বিশ্বমানের ইমিগ্রেশন
১৬ ডিসেম্বর সফট ওপেনিং : তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শনে বিমানমন্ত্রী
Printed Edition
দেশের প্রধান বিমানবন্দরকে আরো গতিশীল, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বড় উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের পুরোপুরি আধুনিক, দ্রুতগতির ও নিরাপদ করে তুলতে একটি নতুন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ৪৯ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে গৃহীত এই প্রকল্পের লক্ষ্য আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পরিকাঠামোকে বিশ্বমানের স্তরে পৌঁছে দেয়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে আগামী বছরের জুন মাস- এই এক বছরের মধ্যেই প্রকল্পের সব কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এদিকে গতকাল তৃতীয় টার্মিনালের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে গিয়ে বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালের সফট ওপেনিংয়ের কাজ চলছে, তবে পুরোপুরি চালুতে আরো সময় প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের দলিল বা নথি অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর ফলে ইমিগ্রেশন কার্যক্রমে যাত্রীদের পরিচয় যাচাই, পাসপোর্ট পরীক্ষা, বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে এই বাড়তি চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইমিগ্রেশন অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট যাচাই, উচ্চগতির ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, কেন্দ্রীয় স্টোরেজ, সার্ভার ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-সমর্থিত ইমিগ্রেশন ডেস্ক কম্পিউটার এবং মাল্টিমোডাল বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
ই-পাসপোর্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : নতুন ব্যবস্থায় থাকবে বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট যাচাই, উচ্চগতির ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এবং কেন্দ্রীয় তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা। ই-পাসপোর্ট রিডারের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন ডেস্কে ব্যবহার করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমর্থিত কম্পিউটার। থাকবে মাল্টিমোডাল বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও। ফলে একাধিক বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে যাত্রীর পরিচয় যাচাই আরো দ্রুত এবং নির্ভুল ভাবে করা সম্ভব হবে। নথিতে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জাল পাসপোর্ট, ভুয়া পরিচয়, মানবপাচার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়বে। একই সাথে সাইবার হামলা ঠেকাতেও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
১৬ ধরনের সরঞ্জাম : প্রকল্পে মোট ১৬টি আইটেম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার থেকে কেন্দ্রীয় স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, ফায়ারওয়াল, ই-পাসপোর্ট রিডার, এআই-সমর্থিত ইমিগ্রেশন ডেস্ক কম্পিউটার- সবই রয়েছে সেই তালিকায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পরিষেবা যাতে থমকে না যায়, তার জন্য থাকবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা। অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে তৈরি করা হবে উচ্চগতির সংযোগও।
প্রযুক্তিতে খরচের বড় অংশ : প্রকল্পের মূলধনী খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার ও বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার জন্যই বরাদ্দ প্রায় ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রকল্প দফতরের আসবাবপত্র ও তৈজসপত্রের জন্য ১০ লাখ এবং প্রকল্প পরিচালকের দফতরের কম্পিউটার ও সরঞ্জামের জন্য ৯ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সম্মানী বাবদ ৪৯ লাখ টাকা, নথি ও টেন্ডার ছাপা এবং বাঁধাইয়ের জন্য দুই লাখ, স্টেশনারির জন্য তিন লাখ এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে চার লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্পে ২ শতাংশ ‘প্রাইস কন্টিনজেন্সি’ হিসাবে রাখা হয়েছে প্রায় ৯৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
লক্ষ্য শুধু গতি নয়, নিরাপত্তাও : নতুন ব্যবস্থা চালু হলে ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সাথে পরিচয় যাচাই হবে আরো দ্রুত ও নির্ভুল। বিপুল পরিমাণ যাত্রী-তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের সুযোগও তৈরি হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ভবিষ্যতে যাত্রীসংখ্যা আরো বাড়লেও যাতে পরিকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেই বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি সংযোজন এবং অন্যান্য সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থার সাথে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে এই কাঠামোয়। অর্থাৎ, তৃতীয় টার্মিনালের সাথে শুধু বিমানবন্দরের পরিসরই বাড়ছে না- বদলে যেতে চলেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশনের প্রযুক্তিগত চেহারাও।
১৬ ডিসেম্বর সফট ওপেনিং, পুরোপুরি চালুতে আরো সময় প্রয়োজন- তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শনে বিমানমন্ত্রী
আগামী ১৬ ডিসেম্বর তারিখকে সম্ভাব্য বিবেচনায় নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিংয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে পুরোপুরি চালু হতে আরো সময়ের প্রয়োজন হবে। বিগত সরকারের আমলে এই টার্মিনালের ভবন উদ্বোধন করা হলেও এটি চালুর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। টার্মিনালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়নি এবং কার্যক্রম পরিচালনার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাও ছিল না।
গতকাল সকাল ১০টায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত তৃতীয় টার্মিনালের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনের পর ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন।
এ সময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী তৃতীয় টার্মিনালের কাজের অগ্রগতি সরজমিন তদারকি করেন এবং উপস্থিত জাপানি কনসোর্টিয়াম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা প্রদান করেন।
ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে সেবার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নতুন টার্মিনালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাথে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ করা হবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক কবু চবৎভড়ৎসধহপব ওহফরপধঃড়ৎ (কচও) এর মাধ্যমে সেবার মান মনিটরিং করা হবে। বর্তমানে প্রথম ব্যাগেজ ১৮ মিনিটে যাত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এই সময়কে আরো কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলমান। তাছাড়া টার্মিনালের এয়ারক্র্যাফট ল্যান্ডিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হবে।
টার্মিনালের রেভিনিউ শেয়ারিং প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পূর্বে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী রাজস্বের ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ এবং বাকি ৮৫ শতাংশ জাপানি কোম্পানির পাওয়ার কথা ছিল। তবে বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে সেই অনুপাত পরিবর্তন করে বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ ২৭ শতাংশে উন্নীত করেছে।
পরিদর্শনকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।