গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে তুরস্ক-হামাস বৈঠক

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা
  • অভিভাবকত্ব ও নিরস্ত্রীকরণ হামাসের প্রত্যাখ্যান

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল আঙ্কারায় হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি এবং চুক্তিকে দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে নেয়ার বিষয় আলোচনা হয় বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইসরাইল। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানিয়েছে, হামাস কর্মকর্তারা ফিদানকে বলেছেন তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত পূরণ করেছেন। তবে ইসরাইলের অব্যাহত হামলা চুক্তিকে দ্বিতীয় ধাপে যেতে বাধা দিচ্ছে।

হামাস কর্মকর্তারা আরো বলেন, গাজায় প্রবেশ করা মানবিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। ওষুধ, আশ্রয় সংক্রান্ত সরঞ্জাম এবং জ্বালানি জরুরি প্রয়োজন। অন্য দিকে, ইসরাইলি সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে ৪ হাজার ২০০ ট্রাক গাজায় প্রবেশ করছে। খাদ্য সরবরাহ মানবিক সংস্থার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমন্বয় করা হচ্ছে। উভয় পক্ষই প্রথম ধাপের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। হামাস এখনো এক বন্দীর লাশ ফেরত দেয়নি, আর ইসরাইল মিসর-গাজা সীমান্তের রাফাহ ক্রসিং দুই দিকে খুলতে অস্বীকার করেছে। তারা শুধু গাজা থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরাইলি সেনারা জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন প্রায়ই হলুদ রেখা অতিক্রম করা হামলাকারী ও সন্দেহভাজনদের হত্যা করেছে। এ সময় তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি সেনারা গতকাল বুধবার গাজায় হামলা চালিয়েছে। এতে একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আনাদোলু। চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, উত্তর গাজার জাবালিয়া শহরে বাড়িঘরে গুলি চালালে একজন নিহত এবং ৯ জন আহত হন। এ এলাকা থেকে সেনারা অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে সরে গিয়েছিল। অন্য দিকে, ইসরাইলি ড্রোন দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালায়। এতে তিনজন ফিলিস্তিনি আহত হন। তারা সামরিক এলাকার সীমান্তে কাঠ সংগ্রহ করছিলেন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল আলুতুফাহ এলাকায় বিমান হামলা চালায়। একই সময়ে গোলাবর্ষণ ও গুলিও চলে। কেন্দ্রীয় গাজার আলুবুরেইজ শরণার্থী ক্যাম্পে ইসরাইলি সামরিক যান ও হেলিকপ্টার থেকে তীব্র গুলি চালানো হয়। এতে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর লক্ষ্যবস্তু হয়। দক্ষিণের খান ইউনিস ও রাফাহ শহরেও ইসরাইলি বিমান হামলা হয়েছে। তবে এসব এলাকায় হতাহতের খবর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, গত ১০ অক্টোবর থেকে ইসরাইলি সেনারা ৮৭৫ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এতে ৪০০ জনের বেশি নিহত এবং এক হাজার ১০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অফিসের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

অভিভাবকত্ব ও নিরস্ত্রীকরণ হামাসের প্রত্যাখ্যান

হামাসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে স্পষ্ট নিশ্চয়তা ও বিস্তারিত প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। এতে অভিভাবকত্ব, নিরস্ত্রীকরণ বা ফিলিস্তিনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপ থাকতে পারবে না। এ খবর জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।

হামাস নেতা ওসামা হামদান মঙ্গলবার রাতে টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানছে না এবং বারবার আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে। তিনি বলেন, ইসরাইল দ্বিতীয় ধাপে যেতে চাইছে না । কারণ এতে গাজা থেকে পূর্ণ প্রত্যাহার এবং প্রতিরোধ শক্তির উপস্থিতি বজায় রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। হামদান বলেন, ‘আমাদের সংজ্ঞায় দ্বিতীয় ধাপ মানে অভিভাবকত্ব প্রত্যাখ্যান, নিরস্ত্রীকরণ প্রত্যাখ্যান এবং অভ্যন্তরীণ ফিলিস্তিনি বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান। আমাদের নিরস্ত্রীকরণে বিদেশী বাহিনী দরকার নেই। যে অস্ত্র দখলদার দুই বছরে নিতে পারেনি, তা তারা নিতে পারবে না।’

এর আগে মঙ্গলবার হামাস জানিয়েছে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের গাজায় সেনা বজায় রাখা ও উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপনের মন্তব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেছেন, কাটজের বক্তব্য ইসরাইলি সরকারের সম্প্রসারণবাদী উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছে এবং দেখিয়েছে যে তারা গাজার জনগণকে বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।

হামাস নেতা হত্যায় আজীবন কারাদণ্ড তিউনিসিয়ার আদালতে

তিউনিসিয়ার একটি আদালত হামাসের সামরিক শাখার শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ জোয়ারি হত্যার মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। গত মঙ্গলবার আদালত অভিযুক্তদের আজীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত অন্যান্য অভিযোগে ১১ জন আসামিকে, যাদের মধ্যে তিউনিসিয়ান ও বিদেশী নাগরিক রয়েছে, প্রত্যেককে ১০০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত খবরে এ তথ্য জানা যায়।

মোহাম্মদ জোয়ারি ছিলেন তিউনিসিয়ান প্রকৌশলী এবং হামাসের ইজ্জুদ্দিন আল কাসসাম ব্রিগেডের অন্যতম নেতা। ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর দক্ষিণ তিউনিসিয়ার স্ফাক্স শহরে নিজের বাড়ির সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যাপকভাবে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে দায়ী করা হয়। ১৯৬৭ সালে জন্ম নেয়া জোয়ারি স্ফাক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় তিনি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধে যোগ দেন। তিনি কাসসাম ব্রিগেডের ড্রোন ইউনিট প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ‘আবাবিল ১’ ড্রোন তৈরিতে যুক্ত ছিলেন, যা ২০১৪ সালে ইসরাইলের গাজা যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়।

হামাস তার মৃত্যুর পর জানায়, জোয়ারির গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রকৌশল জ্ঞানকে কার্যকর সামরিক অস্ত্রে রূপান্তর করেছিলেন। কাসসাম ব্রিগেড তাকে ‘ড্রোনের শহীদ’ আখ্যা দিয়ে বলেছিল, তার মৃত্যু তাদের সামরিক শাখার জন্য বড় ক্ষতি। যদিও সব আসামি এখনো পলাতক, আদালতের এই রায় মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জোয়ারি হত্যাকাণ্ড তিউনিসিয়া ও আরব বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এতে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার, বিশেষ করে ইসরাইলি মোসাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনে জোয়ারিকে এখন প্রযুক্তিগত প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কাসসাম ব্রিগেড তার সম্মানে একটি আত্মঘাতী ড্রোন ও একটি মানববিহীন সাবমেরিনের নামকরণ করেছে।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ডে অংশ নিতে ১০০ চিকিৎসক স্বেচ্ছাসেবক

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, প্রস্তাবিত মৃত্যুদণ্ড আইন পাস হলে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অংশ নিতে ১০০ জন চিকিৎসক স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন। মঙ্গলবার কনেসেটের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক উত্তপ্ত অধিবেশনে তিনি এ দাবি করেন বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।

অধিবেশনে বেন-গভিরের প্রস্তাবিত বিল নিয়ে আলোচনা হয়। বিলটি অনুযায়ী, কোনো বন্দী যদি ইহুদি হত্যায় অংশগ্রহণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে তা কার্যকর করতে হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে। টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া অধিবেশনের ভিডিওতে দেখা যায়, বেন-গভির বলেন, গাজা থেকে ‘ইসরাইলি জীবিত বন্দী’ ফেরার পর এ আইন কার্যকর না করার কোনো অজুহাত নেই। যদিও ইসরাইলি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন আগেই জানিয়েছিল, আইন পাস হলেও তারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অংশ নেবে না, বেন-গভির দাবি করেন ১০০ জন চিকিৎসক স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা বলেছেন, আমরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অংশ নিতে স্বেচ্ছাসেবক।’ বেন-গভির আরো দাবি করেন, শিন বেত এ বিলকে সমর্থন করছে এবং মনে করছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে প্রতিরোধ বাড়বে। তার এ বক্তব্য অধিবেশনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জোলাত ইনস্টিটিউট ফর ইক্যুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের মহাপরিচালক আইনাত ওভাদিয়া বলেন, বেন-গভিরই শেষ ব্যক্তি যিনি প্রতিরোধ, শাসন বা নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার যোগ্য। তার শাস্তি সংক্রান্ত মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। ওভাদিয়া বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড কোনো শাস্তি নয়; এটি হত্যা।’ জবাবে বেন-গভির তাকে হত্যাকারী ও হামাসকে সমর্থন করার অভিযোগ তোলেন।

গাজায় হামাসের আর্থিক কর্মকর্তাকে হত্যা করার দাবি ইসরাইলের

ইসরাইলি সেনারা জানিয়েছে, গাজায় দুই সপ্তাহ আগে চালানো এক হামলায় তারা হামাসের এক আর্থিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। ডিসেম্বরের ১৩ তারিখে চালানো ওই হামলায় হামাসের সামরিক কমান্ডার রায়েদ সাদও নিহত হন। ইসরাইল তাকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিবেচনা করে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া।

ইসরাইলি সেনার আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিখাই আদ্রেয় গতকাল বুধবার জানান, আবদুল হাই জাকুত রায়েদ সাদের সাথে একই গাড়িতে ছিলেন। ইসরাইলি সেনা ও শিন বেতের যৌথ অভিযানে তিনি নিহত হন। আদ্রেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, জাকুত হামাসের সামরিক শাখার আর্থিক বিভাগে যুক্ত ছিলেন। তিনি গত এক বছরে হামাসের সামরিক শাখায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক কোটি ডলার সংগ্রহ ও স্থানান্তরের দায়িত্বে ছিলেন। হামাসের গাজা শাখার নেতা খালিল আল হাইয়া ১৪ ডিসেম্বর রায়েদ সাদ ও তার সাথীদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন, তবে জাকুতের নাম উল্লেখ করেননি। ইসরাইলি সেনারা জানিয়েছে, রায়েদ সাদ হামাসের অস্ত্র উৎপাদন বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং সংগঠনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির তত্ত্বাবধান করতেন।