রাজশাহী বিভাগে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন

Printed Edition

রাজশাহী ব্যুরো

রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় বৃহস্পতিবার শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বা সহিংস ঘটনা ঘটেনি বলে বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। নারী-পুরুষ ও তরুণ ভোটাররা নির্বিঘেœ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

রাজশাহী বিভাগে ৩৯টি আসনে মোট ২১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে তিনজন ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সবচেয়ে বেশি সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ১১ প্রার্থী রয়েছেন। বিভাগে ২১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’। সবচেয়ে বেশি সাত আসন বগুড়ায়, সবচেয়ে কম দু’টি জয়পুরহাটে। বিভাগে মোট ১১ জন নারীপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী- আটটি রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৭০ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ ছাড়া নাটোর জেলায় ৭২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, বগুড়া জেলায় ৭২ দশমিক ১০ শতাংশ ও সিরাজগঞ্জ জেলায় ৬৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিভাগের বাকি চারটি জেলায় কত শংতাংশ ভোট পড়েছে সে ব্যাপারে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত কন্ট্রোল রুম।

সকাল সাড়ে সাতটায় ছয়টি আসনে ৭৮২টি কেন্দ্রে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শুরু হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বেশ ভালো উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। নারী-পুরুষ ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন।

এদিকে এই ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালন করে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনীর সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি মোবাইল টিমও কাজ করে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী- রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানাধীন শিরইল কলোনি উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও ধারণের অভিযোগে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। পরে তাদেরকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঘটনা ঘটে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন চন্দ্রিমা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ইমরান আলী (২৬) ও মো: শাহরিয়ার (২৫)। তাদের দু’জনের বাড়ি শিরইল কলোনির কানাই মোড়।

নারী স্বতন্ত্র প্রার্থীকে চড়থাপ্পড় : রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগমকে ভোটকেন্দ্রের সামনে চড়থাপ্পড় মারা হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে পবার নলখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। হাবিবা বেগম ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। তিনি মোহনপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। হাবিবা উপজেলা কৃষক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

তাকে মারধরের একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। দাঁড়িয়ে কথা বলার একপর্যায়ে হঠাৎ করে এক ব্যক্তি হাবিবাকে সজোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এরপর হাবিবা লুটিয়ে পড়েন। কোনোমতে সামলে উঠে দাঁড়াতেই আবার তাকে থাপ্পড় মারা হয়। এরপর হাবিবার সাথে থাকা লোকজন তাকে রক্ষা করেন। আর আরেক ব্যক্তি মারধর করা ব্যক্তিকে নিয়ে দূরে সরে যান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যিনি মারধর করছিলেন, তার নাম রজব আলী। তিনি পবার হরিয়ান ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি।

ঘটনার পর দুই বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে ভোটকেন্দ্রের সামনে একটি চেয়ারে বসে থাকেন হাবিবা। তখন তিনি জানান, ভোটকেন্দ্রের সামনে এসে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করছিলেন এবং ভোট চাইছিলেন এই বলে যে আগে তিনি প্রচারণায় আসতে পারেননি, তারপরও ভোটাররা যেন তাকে ফুটবল প্রতীকে ভোট দেন।

হাবিবা জানান, তার এই প্রচারণায় বাধা দিয়েছিলেন বিএনপি নেতা রজব আলী। এসময় কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে চড়থাপ্পড় মারা হয়।

বিকেল ৪টার দিকে হাবিবাকে একটি প্রাইভেট কারে তুলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাবিবা জানান, মারধরের কারণে তিনি কানে শুনতে পাচ্ছেন না। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ঘটনাস্থলে বিএনপি নেতা রজব আলীকে পাওয়া যায়নি। ভোটকেন্দ্রের সামনে ছিলেন হরিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, রজব আলী তাদের দলের নেতা। কিন্তু এই ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছে, তা তিনি জানেন না।

রাজশাহীর কাটাখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কাদেরী বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়া নিয়ে একজন প্রার্থীর সাথে বাগি¦তণ্ডা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু মারধরের ঘটনা আমার জানা নেই।’

সিরাজগঞ্জে যুবককে দুই বছরের কারাদণ্ড : সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করায় রুবেল হোসেন (২২) নামের এক যুবককে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে এই সাজা দেয়া হয়। তবে ওই যুবক কোন দলের সমর্থক তা জানা যায়নি।

গতকাল দুপুরে উপজেলার কয়ড়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা কেন্দ্রে এক প্রবাসীর ভোট দিতে গিয়ে তিনি আটক হন।

বগুড়ায় নির্বাচনী বুথে হামলা-ভাঙচুর : বগুড়া-৬ (সদর) আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী বুথ ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে।

সকাল ৯টার দিকে মহিষবাথান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে শেখেরকোলা ইউনিয়ন জামায়াতের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মাহফুজুর রহমান নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোট গ্রহণ শুরুর কিছু সময় পর বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিএনপির একদল কর্মী জামায়াতের বুথটিতে হামলা চালায়। এতে জামায়াতের অন্তত তিনজন আহত হন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভাঙা চেয়ার ও পুড়িয়ে দেয়া ভোটার তালিকা উদ্ধার করা হয়। বগুড়া শহর জামায়াতের গণমাধ্যমবিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন এ অভিযোগ করেন।

তবে হামলার অভিযোগের বিষয়ে জেলা যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপির নিশ্চিত বিজয় দেখে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেরাই নিজেদের জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে দেয়া অভিযোগটি আমরা আমলে নিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।