গাজা থেকে ভেনিজুয়েলা : ‘আইনের রক্ষক’- মুখোশ খুলে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের
মিডলইস্ট আই-এর মতামত কলাম
Printed Edition
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা থেকে শুরু করে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কথিত গ্রেফতার- বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ‘ভালো পুলিশ-খারাপ পুলিশ’ নাটক সাজিয়ে নিজেদের আইনের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই বয়ান ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
গাজায় টানা ২৫ মাস ধরে চলা ইসরাইলি হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বরাবরই ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বাস্তবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তাতেই এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে। তবু পশ্চিমা সরকার ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইনের রক্ষক’ ইমেজ অটুট রাখার চেষ্টা অব্যাহত।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার দাবি পরিস্থিতিকে আরো ঘনীভূত করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য। অথচ ঘটনাটিকে ‘মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ’ হিসেবে তুলে ধরছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধকে বৈধতা দেয়ার যে কৌশল নেয়া হয়েছিল, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই আইনি বয়ান প্রয়োগ করা হচ্ছে।
গাজার ক্ষেত্রে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইল প্রায় এক হাজারবার তা লঙ্ঘন করেছে বলে বিভিন্ন সংস্থার হিসাব। একই সাথে ৩৭টি মানবিক সহায়তা সংস্থাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবুও যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইসরাইলকে ‘শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শতভাগ সফল’ বলে অভিনন্দন জানিয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর ভেতরেও এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হচ্ছে। ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকে ‘ঘৃণামূলক সমাবেশ’ আখ্যা দিয়ে দমন করা হচ্ছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতার, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিচার ছাড়াই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাও ঘটছে। জাতিসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) বিচারকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোও চাপের মুখে। গাজায় সম্ভাব্য গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত শুরু করায় আইসিসি ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কঠোর অবস্থান ‘মাইট ইজ রাইট’ রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা থেকে ভেনিজুয়েলা, সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র আইন প্রয়োগের ভাষা ব্যবহার করে শক্তির রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের ধারণা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ‘বহুদিনের ‘ভালো পুলিশ’ মুখোশের আড়ালে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমেই একটি ‘সিরিয়াল ভিলেন’-এর রূপ নিচ্ছে’- এমন ধারণাই জোরালো হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।