মার্জিন ঋণ বিধিমালার দিকে তাকিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সংশোধিত মার্জিন রুলস কেমন হবে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এর উত্তর পেতে অপেক্ষা করছে। বাজারের বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ রাখলেও অনেকেই আবার ঋণের সুযোগ ব্যবহার করে বিনিয়োগসীমা বাড়িয়ে তা থেকে সুফল পেতে চান। তবে বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মত হলো, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ তাই এখানে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়। ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর এ সত্যই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার পরও অন্য যেকোনো ব্যবসার মতো এখানেও কর্তৃপক্ষ ঋণ প্রদানের সুযোগ রেখেছে।
শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি ও লেনদেনের গতি বাড়াতে মার্জিন ঋণের নিয়মকানুন শিথিল করার পথে হেঁটে ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু নতুন খসড়ায় সংযোজিত ‘পিবি রেশিও’ বা প্রাইস টু বুক ভ্যালু শর্তটি উল্টো বীমা খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির জন্য মার্জিন ঋণ-সুবিধা হারানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে এটি প্রকাশে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে বাজারেও। শেষ পর্যন্ত সমালোচনার মুখে বিধানটি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে কমিশন।
এ পরিস্থিতিতে নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেয়ার পর বাজারে তারল্য বাড়াতে ‘বিএসইসি (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ ফের সংশোধনের উদ্যোগ নেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের মেয়াদে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিধিমালাটি প্রথমবার গেজেট হয়েছিল। বর্তমান কমিশন অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে দ্রুত একটি সংশোধিত খসড়া তৈরি করে জনমত চেয়ে প্রকাশ করেছে। খসড়ায় বিনিয়োগকারী ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেশ কিছু সুবিধাজনক পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে। মার্জিন ঋণ পেতে বিও অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম সিকিউরিটিজের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ টাকা করার সুপারিশ এসেছে। কম ডিভিডেন্ডদাতা ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও ঋণ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্রোকারেজ হাউজসহ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণের সীমাও বাড়ানো হয়েছে খসড়ায়। গ্রাহকের ইকুইটির বিপরীতে মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত এখন থেকে সব ক্ষেত্রে সমান ১:১ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, আগে যা পরিস্থিতিভেদে ১:১, ১:০.৫ কিংবা ১:০.২৫ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান চাইলে অবশ্য নিজস্ব নীতিতে এর চেয়ে কম ঋণও দিতে পারবে। বিষয়টি অনেকটা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারে থাকবে।
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে নিট সম্পদের বিপরীতে অর্থায়নের সীমাও তিন গুণ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ গুণ করার প্রস্তাব রয়েছে; অর্থাৎ ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে আগে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা ঋণ দেয়া গেলেও নতুন নিয়মে তা ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারবে। একক কোম্পানির শেয়ারে এক্সপোজার সীমা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা এবং মার্জিন কলের সীমা ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭০ শতাংশ নির্ধারণেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যদিও ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে নোটিশ ছাড়া ফোর্সড সেলের নিয়মে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। পাশাপাশি মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ৩০-এর বেশি হলে সেই শেয়ার মার্জিন ঋণের অযোগ্য বিবেচিত হবে।
এত সব স্বস্তিদায়ক প্রস্তাবের মধ্যেই বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ‘পিবি রেশিও’ শর্তটি। খসড়ায় বলা হয়েছে, বীমা খাতের কোনো কোম্পানির পিবি রেশিও ১-এর বেশি হলে সেই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না; অর্থাৎ শেয়ারের বাজারদর সর্বশেষ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) চেয়ে বেশি হলেই ঋণ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এই হিসাবে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বীমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র সাত-আটটি প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণ পাওয়ার যোগ্য থাকছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অবশ্য পিবি রেশিওর সীমা ৩-এর বেশি হলে ঋণ বন্ধ হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়ে তেমন আপত্তি ওঠেনি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর মূলত নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছিই থাকে। ফলে অন্য কোনো শর্তে না আটকালে এই খাতে পিবি রেশিওর কারণে ঋণ পেতে বাধা থাকবে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট হলেও নিয়মিত ভালো লভ্যাংশ দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি, যার ফলে এসব শেয়ারের বাজারদর সচরাচর নিট সম্পদমূল্যের বেশি থাকে। বিপরীতে খেলাপি ঋণ ও ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছিই থেকে যায়। এই বাস্তবতায় তারা মনে করছেন, বীমা খাতের জন্য পিবি রেশিওর সীমা বাড়ানো কিংবা প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করাই যুক্তিসঙ্গত হবে।
গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় সংশোধিত মার্জিন বিধিমালার এই খসড়া অনুমোদনের পর থেকেই বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫,২০০ পয়েন্ট থেকে ৬,০০০ পয়েন্টের কাছাকাছি ওঠার পর ফের নিম্নমুখী হতে শুরু করে। সংশ্লিষ্টরা এই পতনের জন্য মূলত ‘পিবি রেশিও’ প্রস্তাবকেই দায়ী করছেন। সর্বশেষ ২২ জুলাই সূচকটি ২৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৫,৮৭১ পয়েন্টে; ওই দিন তালিকাভুক্ত ৫৮টি বীমা কোম্পানির মধ্যে ৫২টিরই দর কমেছে, বেড়েছে মাত্র তিনটির, একটির দর অপরিবর্তিত থেকেছে এবং দু’টির কোনো লেনদেনই হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, নতুন কোনো পরিবর্তন এলে তা প্রথমবার বুঝে উঠতে না পারায় দ্বিধা তৈরি হয়। পিই রেশিও দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হওয়ায় সহজবোধ্য হলেও পিবি রেশিও তুলনামূলক নতুন নাম বলে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। যদিও এটিও একটি আন্তর্জাতিক প্রচলিত পদ্ধতি। তিনি জানান, অংশীজনদের সাথে আলোচনা করেই খসড়াাটি মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। সব মতামত পর্যালোচনার পরই চূড়ান্ত বিধিমালা তৈরি করা হবে। বাজার যেহেতু এই পরিবর্তন সহজভাবে নিতে পারছে না এবং এর প্রভাবে বড় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তাই এটি অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, কোনো বিষয় ঠিকভাবে না বোঝা অবস্থায় কার্যকর হলে তা উল্টো ফল দিতে পারে, আর যেহেতু কমিশন বাজারবান্ধব, তাই বিনিয়োগকারীদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া হবে না। যৌক্তিক আপত্তি এলে সেসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।