এলডিসি উত্তরণে ঝুঁকিতে ১ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রফতানি

প্রণোদনা ও শুল্কসুবিধা হারানোর শঙ্কা

Printed Edition

শাহ আলম নুর

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান কৃষিপণ্য রফতানি খাত এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রফতানিকারকদের আশঙ্কা, ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারালে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কৃষিপণ্য রফতানি প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। তৈরী পোশাকের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিস্কুট, নুডলস, জুস, ফ্রোজেন পরোটা ও চানাচুর এই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যগুলোই রফতানি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এসব পণ্যের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশের সাথে সাথে যে প্রণোদনা ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে, তাতে এই অর্জন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কৃষি ও কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রত্যাহারের সরকারি পরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণোদনা উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিদেশী বাজারে মান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলার অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রণোদনা উঠে গেলে রফতানি পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। একটি শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ক্রেতারা অত্যন্ত মূল্যসংবেদনশীল। সামান্য দাম বাড়লেই তারা বিকল্প উৎসে চলে যায়। প্রণোদনা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।’

দেশের রফতানিকারকদের মতে, তৈরী পোশাক খাতের মতো বড় আকারের উৎপাদন ও সুপ্রতিষ্ঠিত সরবরাহ চেইন কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাতে এখনো গড়ে ওঠেনি। কাঁচামালের দামের ওঠানামা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবহন জটের কারণে এই খাত তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এলডিসি উত্তরণের পর বড় বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) সুবিধা হারানো কৃষিপণ্য রফতানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও কিছু বাজারে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রূপান্তরকালীন সুবিধা থাকবে, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বাজারে শেষ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হলে দামের প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, পোশাক খাতের তুলনায় কৃষিপণ্যে শুল্কহার তুলনামূলক কম হলেও বিস্কুট, স্ন্যাকস ও ইনস্ট্যান্ট হ খাবারের মতো দামের ওপর নির্ভরশীল পণ্যে সামান্য শুল্কও চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে। যেসব দেশ ইতোমধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা বিশেষ অগ্রাধিকার সুবিধা পাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের জায়গা দখল করতে পারে।

একজন বাণিজ্যনীতি বিশ্লেষক বলেন, ‘এলডিসি-উত্তর পরিস্থিতি বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনবে। কৃষিপণ্য রফতানি এখনো বৈশ্বিক বাজারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। হঠাৎ করে শুল্ক বাড়লে এই খাতের গতি থেমে যেতে পারে।’

তথ্যে বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রফতানির সাফল্য এসেছে ধাপে ধাপে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক কারখানা স্থাপন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং হালাল সার্টিফিকেশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বাজারে প্রবেশের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিনিয়োগ করেছে।

তবে রফতানিকারকরা স্বীকার করছেন, বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠিত কৃষিপণ্য রফতানিকারক দেশগুলোর তুলনায় কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে। উচ্চ পরিবহন ব্যয়, বন্দরের অদক্ষতা, পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাব এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়ন পাওয়া আরো বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদের হার ও সীমিত রফতানি ঋণসুবিধার কারণে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন বাজারে প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একটি রফতানিকারক সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন, ‘প্রণোদনা ও শুল্কসুবিধা থাকায় এতদিন এসব দুর্বলতা সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। এগুলো উঠে গেলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।’

এমন প্রেক্ষাপটে রফতানিকারকরা সরকারের কাছে বিকল্প নীতিগত সহায়তা চাচ্ছেন। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রফতানিমুখী কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে কর ছাড়, করপোরেট কর হ্রাস, পরিবহনব্যয়ে ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে রফতানি অর্থায়ন। একই সাথে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। যদিও বাংলাদেশ এফটিএ ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে, তবে অগ্রগতি ধীর বলে অভিযোগ রফতানিকারকদের।

একজন জ্যেষ্ঠ রফতানিকারক বলেন, ‘বাণিজ্য চুক্তি করতে সময় লাগে, কিন্তু এলডিসি-উত্তর বাস্তবতা এখনই শুরু হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা না পেলে আমরা বাজার হারাতে পারি।’ নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, কৃষি-রফতানিতে ধাক্কা লাগলে দেশের সামগ্রিক রফতানি কৌশল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। এই নির্ভরতা কমাতে কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই খাত গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের সাথে সংযোগ এবং মূল্য সংযোজনের বড় সুযোগ তৈরি করে। কৃষি-রফতানির গতি কমে গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে শিল্পায়ন ও গ্রামীণ উন্নয়ন একসঙ্গে এগোতে পারে। এলডিসি-উত্তর সময়ে এই খাতকে সুরক্ষা দেয়া মানে কেবল রফতানি নয়, সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।’

সরকারি কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে এলডিসি-উত্তরণ কৃষি-রফতানির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তবে তারা বলছেন, রাজস্ব সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিয়ে প্রণোদনা ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি মো: আহসানুজ্জামান লিন্টু বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খাতভিত্তিক চাহিদা পর্যালোচনা করে নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ ও নীতিগত সংস্কারের মতো অ-নগদ সহায়তার দিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানি খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলার রফতানি সম্ভাবনার প্রমাণ দিলেও, সময়োপযোগী নীতিসহায়তা ছাড়া এই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন।

তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হচ্ছে এবং বাণিজ্যসুবিধা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনদক্ষতা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজার প্রবেশাধিকার, এই তিনের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানির ভবিষ্যৎ।