ঋণ নিয়ে পাচার ঠেকাতে কঠোর বাংলাদেশ ব্যাংক

৫০ কোটি হলেই অডিট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
first-1
ঋণ নিয়ে পাচার ঠেকাতে কঠোর বাংলাদেশ ব্যাংক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক লুটেরা এস আলমের মতো এক ধরনের অলিগার্ক শ্রেণী কাগুজে প্রকল্পের নামে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতেন না। ঋণের একটি বড় অংশই পাচার হয়ে যেত। আবার এসব ঋণের অর্থ কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে তারও কোনো তদারকি করা হতো না। এর ধকল এখন পোহাচ্ছে ব্যাংকিং খাতসহ দেশের অর্থনীতি। সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের ভারে ব্যাংকিং খাতের অনেকটা ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণের অর্থের অপব্যবহার, কাগুজে প্রকল্পের নামে অর্থ বের করে নেয়া ঠেকাতে এবার বড় ঋণের ব্যবহার সরাসরি তদারকিতে নামছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ কোথায় ও কিভাবে ব্যবহার হয়েছে তা যাচাই করতে অডিট রিপোর্ট জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর ফলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের পর ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না বরং ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেটিও নজরদারির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের ঝুঁকি যে কতটা বেড়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ইতোমধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ, মার্চ ২০২৫-এ এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মোট পরিমাণ ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ বড় ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি এসব ঋণের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। একমাত্র ব্যাংক লুটেরা এস আলমই ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। যার বেশির ভাগই পাচার হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিসহ বড় বড় কেলেঙ্কারি ঘটে আওয়ামী সরকারের ১৫ বছরে। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় শেষ পাঁচ বছরে। ২০১৭ সালের পর এস আলম একে একে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো দখলে নিয়ে লুটপাট চালায়। যার ধকল এখন ব্যাংকিং খাতসহ দেশের অর্থনীতি বহন করছে। ইতোমধ্যে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার সময় গ্রাহককে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য দেখাতে হয়। শিল্পকারখানা স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কাঁচামাল আমদানি, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা চলতি মূলধনের জন্য ঋণ নেয়া হলেও বাস্তবে সেই অর্থ অন্য খাতে চলে যাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠান, সহযোগী কোম্পানি বা ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের ঘটনাও সামনে এসেছে। এ ধরনের অনিয়মের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- ব্যাংক যে অর্থ উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের প্রত্যাশায় ঋণ দেয়, সেটি যদি উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে না গিয়ে সম্পদ কেনা, অন্য ঋণ পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাঠানো কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন হিসাবে চলে যায়, তাহলে ঋণের বিপরীতে প্রকৃত নগদ প্রবাহ সৃষ্টি হয় না। একসময় ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। এর বোঝা শেষ পর্যন্ত ব্যাংক, আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ঋণের অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি কিস্তিতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আগের কিস্তির অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে পরবর্তী কিস্তি ছাড় করার নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকির ওপর নির্ভর করলে বড় ঋণের অপব্যবহার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে এবার আরো শক্তিশালী ও স্বাধীন যাচাইব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এস আলমের ঘটনা বড় সতর্কবার্তা : ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে এস আলম গ্রুপের নাম। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে এস আলমসংশ্লিষ্ট ঋণ ও অর্থ পাচারের বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে বড় একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানি, শেল কোম্পানি ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ৩২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণের তুলনায় জামানতের মূল্য ছিল অত্যন্ত কম। বিএফআইইউর অনুসন্ধানে ঋণের অর্থ হুন্ডি, বাণিজ্যিক লেনদেন ও অন্যান্য পদ্ধতিতে বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগও উঠে এসেছে। এই ঘটনা শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনিয়মের বিষয় নয়, এটি দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। কারণ কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত বিপুল অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বের করে নেয়া সম্ভব হওয়ার অর্থ হলো-ঋণ অনুমোদন, জামানত যাচাই, গ্রাহকের প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ-একাধিক স্তরেই দুর্বলতা ছিল।

পাঁচ ব্যাংকের সঙ্কট : এস আলমসংশ্লিষ্ট ঋণের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকও ছিল। এর পরিণতিতে ২০২৫ সালে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। ২০২৬ সালের আগস্টে এসব ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়, বড় ঋণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একটি ব্যাংকের বড় কয়েকজন গ্রাহক বা একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যদি বিপুল ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়, তাহলে শুধু ব্যাংকের লাভ কমে যায় না; ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হয়, আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে ব্যাংক উদ্ধারে অর্থ দিতে হতে পারে।

কেন ৫০ কোটি টাকার সীমা : ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণকে আলাদা গুরুত্ব দেয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে একটি ভুল সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব ছোট ঋণের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের খেলাপি হার ছোট ঋণের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এই শ্রেণীর ঋণের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র দেখে ঋণ অনুমোদন করলেই হবে না। ঋণ নেয়ার পর প্রকল্প বাস্তবে হয়েছে কিনা, যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে কিনা, কাঁচামাল আমদানি হয়েছে কিনা, উৎপাদন শুরু হয়েছে কিনা, বিক্রয় আয় তৈরি হচ্ছে কি না- এসবও যাচাই করা প্রয়োজন। অডিট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করা হলে ঋণগ্রহীতাকে তার অর্থ ব্যবহারের একটি নির্ভরযোগ্য হিসাব দিতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংক জানতে পারবে, ঋণের টাকা অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়েছে কি না। একই সাথে পরে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করাও সহজ হবে।

শুধু অডিট রিপোর্টই যথেষ্ট নয় : বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু অডিট রিপোর্ট জমা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অডিট রিপোর্ট কিভাবে তৈরি হচ্ছে এবং অডিটকারী প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঋণগ্রহীতা যদি নিজের পছন্দের অডিট প্রতিষ্ঠান দিয়ে এমন রিপোর্ট তৈরি করিয়ে নেয়, যেখানে প্রকৃত অনিয়ম ধরা পড়ে না, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই অডিট ফার্ম নির্বাচন, তাদের স্বাধীনতা, রিপোর্ট যাচাই এবং সন্দেহজনক তথ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের জামানত হিসেবে দেয়া জমি ও সম্পত্তি সরাসরি পরিদর্শনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর নির্ভর না করে জামানতের অস্তিত্ব ও প্রকৃত মূল্য যাচাই করতে চায়। অর্থাৎ বড় ঋণ তদারকিতে এখন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে- ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহক ও জামানত যাচাই, ঋণ বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তীতে স্বাধীন অডিট।

অর্থ পাচার ঠেকাতেও ভূমিকা রাখবে : বড় ঋণের ব্যবহার তদারকি শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নয়; এর সাথে অর্থ পাচার প্রতিরোধের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে যদি সেই অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যায়, তারপর বিদেশে পণ্য আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাঠানো হয় কিংবা অন্য কোনো চ্যানেলে দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ঋণের অর্থ ব্যবহারের অডিটে ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, আমদানি-রফতানি নথি, সম্পদ কেনার দলিল, প্রকল্পের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লেনদেন যাচাই করা গেলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিশেষ করে একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণের অর্থ ঘোরানো বন্ধ করতে ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ’ বা প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ জরুরি। একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিভিন্ন নামে একাধিক কোম্পানি তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে শুধু কোম্পানির নাম দেখে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যাবে না।

ব্যাংক পরিচালকদের দায়িত্বও বাড়বে : নতুন তদারকি ব্যবস্থার ফলে শুধু ঋণগ্রহীতাই নয়, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বও বাড়বে। কারণ বড় ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের দেয়া তথ্য যাচাই না করে ঋণ অনুমোদন করা হলে পরবর্তীতে দায় এড়ানোর সুযোগ কমে যাবে। ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন কমিটিকে নিশ্চিত করতে হবে যে গ্রাহকের ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, পূর্বের ঋণের ইতিহাস, অন্যান্য ব্যাংকে দায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগের সাথে বড় ঋণ তদারকির বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান যাচাই করতে সম্পদের গুণগত মান যাচাই বা একিউআর কার্যক্রমও চালাচ্ছে। ১৭টি ব্যাংককে তিন ধাপে এই পর্যালোচনার আওতায় নেয়া হয়েছে।

বড় ঋণের ঝুঁকি এখন পুরো ব্যাংক খাতের : বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ওই সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অন্য দিকে ২০২৬ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের খেলাপি হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানো বড় ঋণের সঙ্কটকে আরো স্পষ্ট করেছে। এ অবস্থায় ঋণের ব্যবহার তদারকির উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি নিয়ম হিসেবে দেখলে হবে না। এটি ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি অংশ। আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে তাদের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগ হবে এবং ব্যাংক সেই অর্থের ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে।

সামনে চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে : তবে নতুন উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের সংখ্যা যদি অনেক হয়, তাহলে প্রতিটি ঋণের অডিট রিপোর্ট যাচাই করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। একই সাথে অডিট রিপোর্টকে শুধু আনুষ্ঠানিক কাগজে পরিণত করা যাবে না। রিপোর্টে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত, ঋণ স্থগিত, অতিরিক্ত অর্থ ছাড় বন্ধ এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা সুবিধা বন্ধ করা। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালকদের স্বার্থের সঙ্ঘাত এবং দুর্বল তদারকির কারণে বড় ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখন সেই সংস্কৃতি বদলাতে না পারলে নতুন নিয়মও কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। সবমিলিয়ে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ব্যবহার যাচাই এবং অডিট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে অডিটের স্বাধীনতা, তথ্যের স্বচ্ছতা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর। এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিপুল ঋণ, পাঁচ ব্যাংকের সঙ্কট এবং সামগ্রিকভাবে বড় ঋণে খেলাপির উচ্চ হার দেখিয়েছে- ঋণ দেয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঋণের টাকা কোথায় গেল তা জানা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে তাই ‘ঋণ বিতরণ’ থেকে নজর সরিয়ে ‘ঋণের ব্যবহার ও ফলাফল’-এর দিকে তদারকির কেন্দ্রবিন্দু নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি।