ক্ষুধার কাছে হার মানেননি ১১৬ বছরের আব্দুল বারী
নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই প্রতিদিন সাইকেলে ছুটে বেড়ান হাঁড়ি পাতিল মেরামতে
Printed Edition
মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, হাঁটতেও কষ্ট হয় তার। তবুও থেমে নেই আব্দুল বারীর জীবন। প্রতিদিন ভোরে জরাজীর্ণ ঘর থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। সাইকেলেই বাঁধা থাকে তার কাজের সরঞ্জাম। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে বেড়ান তিনি হাঁড়ি-পাতিলের ‘কান্দা’ লাগানোর কাজের সন্ধানে। এতে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার জীবন। কাজ না পেলে ফিরতে হয় খালি হাতেই।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারী। নিজের বয়স ১১৬ বছর বলে দাবি করেন তিনি। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী তার জন্ম ১৯২৭ সালের ২০ এপ্রিল। সে হিসাবে চলতি আগস্টে তার বয়স প্রায় ৯৯ বছর। স্থানীয়দের ধারণা, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় বয়স সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ না হওয়ায় এ পার্থক্য হয়ে গেছে। বয়স যতই হোক, দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে তার যেন ক্লান্তি নেই।
সম্প্রতি কবিখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি টিনের ঘরে একাই থাকেন আব্দুল বারী। ঘরটির টিন পুরনো হয়ে গেছে। চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। প্রয়োজনীয় সামান্য জিনিসপত্র ছাড়া ঘরে তেমন কিছুই নেই। এ বয়সেও তিনি কারো ওপর নির্ভর না করে নিজের খাবার নিজেই উপার্জন করে খান।
আব্দুল বারী বলেন, ‘স্ত্রী মারা গেছে সে কবে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন আর কেউ আমার খোঁজ রাখে না। ছেলে নেই। দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে। সাইকেল চালিয়ে কাজের সন্ধানে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে হয়। এতে কষ্ট হলেও পেটে ক্ষুধা তো নিবারণ করতে হবে।’
তিনি জানান, তার বাড়ি কুষ্টিয়ার হালসা কুসা মল্লিকপুরে। মৃত তাসের মল্লিকের ছেলে তিনি। চার ভাই ও দুই বোন ছিলেন তারা। বিয়ের পর ঘর জামাই হিসেবে নিজ গ্রাম ছেড়ে কবিখালী শ্বশুরের জমিতেই গড়ে তোলেন নিজের বসতি। সময়ের সাথে পরিবারের অন্য সদস্যদের আর খোঁজ রাখতে পারেন না। অনেকেই মারা গেছেন। স্ত্রীও বহু বছর আগে মারা যান। দুই মেয়ে নিজ নিজ সংসারে থাকায় জীবনের এ শেষ সময়ে এসে বড় একা হয়ে পড়েন তিনি।
স্থানীয় এনামুল হক, ফজর আলী ও রাহেন আলী বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই তাকে এ ভাবেই দেখে এসেছি। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বের হন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান, হাড়ি-পাতিল মেরামতের কাজ করেন।’
বয়সের কারণে আগের মতো শক্তি নেই আব্দুল বারীর। সাইকেল চালাতেও কষ্ট হয়। তবু ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। কোনো দিন কাজ মেলে, কোনো দিন মেলেও না। আয় হলে খাবারের ব্যবস্থা হয়, না হলে অনিশ্চয়তায় দিন কাটে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও স্বজনের সঙ্গ-কোনোটিই নেই আব্দুল বারীর। বয়স শরীরকে বিশ্রাম নিতে বললেও ক্ষুধার তাড়না তাকে বিশ্রাম নিতে দেয় না। বার্ধক্যে এসেও তার এ জীবনসংগ্রাম যেন বেঁচে থাকার এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।