কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে অভিযান

উগ্রবাদী তকমায় ৯ তরুণকে হত্যায় হাসিনা ও কামালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০১৬ সালে রাজধানীর কল্যাণপুরের ‘জাহাজবাড়িতে’ কথিত অভিযানের নামে ৯ জন তরুণকে হত্যার ঘটনাকে পরিকল্পিত ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখা এই অভিযোগ দাখিল করে। প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগ মূলত তিনটি। ১. সাজানো নাটক; ২. মিথ্যা আলামত; ৩. পুরস্কার ও উৎসাহ। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই রাজধানীর মিরপুর মডেল থানাধীন ৫ নম্বর রোডের ৫৩ নম্বর বাড়িতে (তাজ মঞ্জিল বা জাহাজ বাড়ি) পরিচালিত ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’ কোনো প্রকৃত জঙ্গিবিরোধী অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সাজানো ‘জঙ্গি নাটক’। অভিযোগে দাবি করা হয়, হত্যার শিকার তরুণরা ইসলামী মনোভাবাপন্ন এবং মাদ্রাসাছাত্র ছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন- মোতালেব ওরফে আব্দুল্লাহ, রায়হান ওরফে তারেক, মতিউর রহমান, জুবায়ের হোসেন, সেজাদ রউফ অর্ক, তাজ উল হক রাশিক, আবু হাকিম নাঈম ও আকিফুজ্জামান খান। তাদেরকে ঘটনার বেশ কিছুদিন আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেআইনিভাবে আটক ও অপহরণ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের গোপন বন্দিশালায় গুম করে রাখা হয়েছিল।

অভিযোগের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক এবং ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সরাসরি নির্দেশ ও পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে মিরপুর বিভাগের পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করে ওই ভবনটি ঘেরাও করা হয়। প্রসিকিউশনের ভাষ্য মতে, আগে থেকেই পুলিশের হেফাজতে থাকা ওই ৯ তরুণকে জাহাজবাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্যাটে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয় এবং বাইরে থেকে এমনভাবে ঘেরাও করা হয় যাতে মনে হয় সেখানে একটি জঙ্গি আস্তানা রয়েছে। পরবর্তীতে সিটিটিসির সোয়াট টিমের মাধ্যমে ফ্যাটের ভেতর থাকা নিরস্ত্র ও বন্দী তরুণদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা নিশ্চিত করা হয়। এ ঘটনায় রকিবুল হাসান রিগেন নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন, যাকে পরবর্তীতে গ্রেফতার দেখানো হয়।

অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেন। অভিযানে ব্যবহৃত গুলিগুলো সোয়াট টিমের সদস্যদের নামে ভাগ করে দেখানো হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও কথিত উগ্রবাদী আলামত উদ্ধারের ‘অসত্য জব্দ তালিকা’ তৈরি করা হয়। ২৬ জুলাই দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া নিহতদের দুর্ধর্ষ জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে দেশী-বিদেশ্য সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ান।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই পুরো ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, যিনি হত্যাকা- শেষে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে বিস্তারিত অবহিত করেন। শেখ হাসিনা সরকার এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনিব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের সাহসিকতার রাষ্ট্রীয় পদক (বিপিএম ও পিপিএম) দিয়ে পুরস্কৃত করেন, যা এই ধরনের অপরাধ সংঘটনে সরাসরি রাষ্ট্রীয় উসকানি ও সমর্থনের শামিল। দাখিলকৃত অভিযোগে এই ঘটনাকে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ), (জি) ও (এইচ) ধারার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানানো হয়েছে।

কার্নিশে ঝুলন্ত তরুণকে গুলি : যুক্তি শেষ রাষ্ট্রপরে

এ দিকে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করাসহ দু’জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছে প্রসিকিউশন।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। আসামিপরে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত। যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশনের পে বলা হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সারা দেশের মতো রামপুরায়ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তৎকালীন সরকারের পুলিশবাহিনী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিরস্ত্র আমির হোসেনকে লকরে গুলি চালানো হয়, যা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।

এ ছাড়া আরো দুজনকে শহীদ করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের প্রত্য নির্দেশে এসব হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। স্যা-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যদর্শীর জবানবন্দীসহ নথিপত্রে এ মামলার পাঁচ আসামির সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব, স্যাপ্রমাণের ভিত্তিতে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার প্রার্থনা করছি। এ মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। হাবিবুর ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেন- খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ৭ আগস্ট ফর্মাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন আমির হোসেন নামের এক তরুণ। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলেও তার ওপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন এক পুলিশ সদস্য। এতে জীবন বাঁচলেও গুরুতর আহত হন তিনি। একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নাদিম ও মায়া ইসলাম।