সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বিআরটিএ

সরকারি সেবায় দুর্নীতি ও নাগরিক নিরাপত্তার ডঢ়ল্ফ

Printed Edition
back-1
বিবিএসের সিপিএস প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সচিব আলেয়া আক্তারসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ সংস্থা হিসেবে জনগণের মতামতে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০১৫ অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে ৬৩.২৯ শতাংশ মানুষ এ মত দিয়েছেন।

জরিপে দেখা গেছে, সরকারি সেবা নিতে ঘুষ প্রদান সংক্রান্ত ক্ষেত্রে নোয়াখালী জেলার মানুষ শীর্ষে, যেখানে প্রায় ৫১ শতাংশ নাগরিক সেবা গ্রহণের জন্য ঘুষ দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, গত এক বছরে সরকারি সেবা গ্রহণকারী ৩১.৬৭ শতাংশ নাগরিক ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে জনগণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৫৭.৯৬ শতাংশ) এবং পাসপোর্ট অফিসকে (৫৭.৪৫ শতাংশ) উল্লেখ করেছেন।

নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৪.৮১ শতাংশ মানুষ সন্ধ্যার পর নিজের এলাকায় একা চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন, তবে ১৫.১৯ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ অনুভব করেন। নিরাপত্তার বোধের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য রয়েছে; পুরুষদের মধ্যে ৮৯.৫৩ শতাংশ নিরাপদ বোধ করেন, নারীদের মধ্যে এই হার ৮০.৬৭ শতাংশ। নিজ বাড়ির আশপাশে নিরাপত্তাবোধের হার সর্বোচ্চ ৯২.৫৪ শতাংশ।

সুশাসন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দিক থেকে জরিপে উঠে এসেছে যে, মাত্র ২৭.২৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন তারা সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারেন। রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এই হার আরো কমে ২১.৯৯ শতাংশে নেমে আসে। জাতীয়ভাবে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৪.৬২ শতাংশ) মানুষ মনে করেন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্তর্ভুক্তিমূলক।

সরকারি সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেখা গেছে, গত ১২ মাসে ৪৭.১২ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, ৪০.৯৩ শতাংশ নাগরিকের অন্তত একজন সন্তান সরকারি বিদ্যালয়ে (প্রাথমিক/মাধ্যমিক) অধ্যয়ন করেছেন এবং ৭৩.৭৭ শতাংশ মানুষ অন্যান্য সরকারি সেবা (পরিচয়পত্র/নাগরিক নিবন্ধন) গ্রহণের অন্তত একটি প্রচেষ্টা করেছেন।

স্বাস্থ্যসেবায় সন্তুষ্টি : ৭২.৬৯%

প্রাথমিক শিক্ষায় সন্তুষ্টি : ৮১.৫৬%

মাধ্যমিক শিক্ষায় সন্তুষ্টি : ৭৮.১৮%

অন্যান্য সরকারি সেবায় সন্তুষ্টি : ৬৬.৯১%

জাতীয়ভাবে, ১৬.১৬ শতাংশ মানুষ গত দুই বছরে কোনো বিবাদ বা বিরোধের সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩.৬০ শতাংশই আনুষ্ঠানিক (যেমন: আদালত) অথবা অনানুষ্ঠানিক (কমিউনিটি নেতা) কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করেছেন।

বৈষম্যের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় উঠে এসেছে। দেশের ১৯.৩১ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রধান কারণ আর্থসামাজিক অবস্থান (৬.৮২ শতাংশ) ও লিঙ্গ (৪.৪৭ শতাংশ)। বৈষম্যের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে পরিবারে (৪৯.৭২ শতাংশ), গণপরিবহন বা উন্মুক্ত স্থানে (৩৪.৮২ শতাংশ), এবং কর্মস্থলে (২৪.৮৫ শতাংশ)। মাত্র ৫.৩৭ শতাংশ ভুক্তভোগী কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন।

বিবিএস জানিয়েছে, এই জরিপটি পরিচালিত হয়েছে ৬-২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সময়ে। দেশে ৬৪ জেলার এক হাজার ৯২০টি প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট থেকে ৪৫ হাজার ৮৮৮টি পরিবার এবং ৮৪ হাজার ৮০৭ জন নাগরিক (পুরুষ: ৩৯,৮৯৪, নারী: ৪৪,৯১৩) সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার, বৈষম্যবিষয়ক এসডিজি ১৬-এর ছয়টি সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিবিএস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, মিজ আলেয়া আক্তার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সচিব, পরিকল্পনা বিভাগ এস এম শাকিল আখতার এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।