যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড দুঃখজনক, অস্বাভাবিক না : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

পরিস্থিতির জন্য আমরাই দায়ী : সাহাব খান

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত আরোপের বিষয়টি দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, যেসব দেশের অভিবাসন নিয়ে সমস্যা রয়েছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে একটি। যারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তাদের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা বেশি। এ কারণে যদি কিছু দেশের ওপর তারা বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং তার মধ্যে বাংলাদেশ থাকে, তাহলে সেটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। তবে এটি অবশ্যই দুঃখজনক এবং আমাদের জন্য কষ্টকর।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তৌহিদ হোসেন এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসায়ী ও পর্যটন (বি-১ এবং বি-২) ভিসার জন্য বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশকে পাঁচ হাজার ডলার (প্রায় ছয় লাখ ১২ হাজার টাকা) থেকে ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত বন্ড বা জামানত দিতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী নীতির আওতায় নতুন পদপে হিসেবে এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ভিসা বন্ড কার্যকর হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের বি-১ ও বি-২ ভিসা আবেদনের সাথে ১৮৫ ডলার বা প্রায় ২২ হাজার টাকার অফেরতযোগ্য ফি জমা দিতে হয়। বন্ড আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেছেন, ভিসা বন্ড নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য আমরাই দায়ী। ভারত-পাকিস্তানের মতো আমাদের প্রবাসীরা বাংলাদেশীদের স্বার্থ সংরক্ষণে লবিং গ্রুপ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী উচ্চ আয়ের বাংলাদেশীরা তাদের নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। আর মধ্য ও নি¤œ আয়ের বাংলাদেশীরা স্থানীয় রাজনীতির পরিবর্তে আমাদের দেশের রাজনীতির লেজুরবৃত্তিতে বেশি আগ্রহী, যা অনেক ক্ষেত্রে নিজের মধ্যে হানাহানিতে রূপ নেয়। এটা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করে এবং পুরো সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নীতিগতভাবে প্রথম দিন থেকেই আমরা অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছি। বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর এ ধরনের পদক্ষেপের একমাত্র সমাধান হলো অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা। আমরা পত্রপত্রিকায় দেখি, কেউ (অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে) ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাচ্ছে, কেউ নৌকাডুবির কারণে হাবুডুবু খেয়ে উদ্ধার হচ্ছে। ভিকটিমদের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। তবে একই সাথে এটাও সত্য যে আইনও লঙ্ঘিত হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্রামের যে ছেলেটি ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে কেনিয়া যায়, তার তো আসলে কেনিয়া বা তুরস্কে যাওয়ার সামর্থ্য থাকার কথা না। যতণ পর্যন্ত আমরা এটা বন্ধ করতে না পারব, ততণ ভূমধ্যসাগরে মানুষ মরতেই থাকবে।

বাংলাদেশীদের ওপর ভিসা বন্ড আরোপ ঠেকাতে সরকার কোনো পদপে নেবে কিনা-জানতে চাওয়া হলে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা প্রচলিত কূটনৈতিক পদ্ধতিতেই অগ্রসর হবো। চেষ্টা করব, যেন বাংলাদেশীরা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার এই শর্ত থেকে অব্যাহতি পায়।

ভিসা বন্ড আরোপের কারণ সম্পর্কে সাহাব এনাম খান বলেন, প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীদের হার এশিয়ানদের মধ্যে তো বটেই, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয় ভারত বা পাকিস্তানের চেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাক্স পোর্টফলিওতে বাংলাদেশীদের ভূমিকাও তাই নগণ্য। বাংলাদেশীদের ওপর ভিসা বন্ড আরোপের সিদ্ধান্তে এই অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশটা কাজ করেছে। তৃতীয়ত, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশী লবির দুর্বলতা।

নিরাপত্তার কারণেই টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত : বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ভারত না যাওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপ এবং কথাবার্তার কারণে দেশটির সংস্থাগুলোর জন্য বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা দেয়া কঠিন হবে। এ কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ নজরুল যেটা বলেছেন, আমি তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করি। একজন ক্রিকেটার (মোস্তাফিজুর রহমান) ভারতে সীমিত সময়ের জন্য যাবে, খেলবে, চলে আসবে। তার নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব না হওয়ায় আইপিএল থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের শুধু জাতীয় দল নয়, সমর্থকরাও যাবে। আমরা কি করে বিশ্বাস করব, তারা নিরাপদে থাকবে?

তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপ চালাচ্ছে, কথাবার্তা বলছে। এই পরিপ্রেেিত সত্যিকার অর্থে ভারতীয় সংস্থাগুলোর পে বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা দেয়া কঠিন হবে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিশ্বকাপ খেলব, তবে ভারতের বাইরে খেলব।

ভারতে বাংলাদেশের তিনটি মিশনে ভিসা ইস্যু বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে যে মিশনগুলোতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে আমরা আপাতত ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখতে বলেছি।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটা নিয়ে কথাবার্তা চলছে।