খুদে জাদুকর বনাম বিস্ময় বালক
Printed Edition
ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসরের ফাইনাল। ১১ জুন শুরু হওয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে সেমিফাইনাল। শিরোপা মঞ্চে উঠবে কোন দল- আর্জেন্টিনা নাকি স্পেন। এ নিয়ে তোলপাড় ফুটবল বিশ্ব। এর মাঝেও আরেকটি জোরেশোরে চলছে আলোচনায়। প্রথমবারের মতো সময়ের সেরা তারকা লিওনেল মেসির মুখোমুখি হচ্ছেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল। প্রায় দুই দশক আগে এক দাতব্য ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালকে গোসল করাতে সাহায্য করেছিলেন মেসি। সেই ছবি এখন ফুটবল বিশ্বে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছে। এই শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ইতিহাস গড়ার হাতছানি রয়েছে দুই প্রজন্মের এই দুই ফুটবলারের সামনে। শিরোপা ধরে রাখা এবং অধিনায়ক হিসেবে টানা দু’টি বিশ্বকাপ জয়ে রেকর্ড গড়ার মিশনে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মেসি। অন্য দিকে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের মধ্যে বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে ইয়ামাল। ম্যাচটি শুধু দুই দেশের লড়াই নয়, বরং এক কিংবদন্তি এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরির মধ্যে আদর্শ এক দ্বৈরথ। এই ফাইনালের মধ্য দিয়ে ফুটবলে এক নতুন অধিনায়কের আগমন কিংবা পুরনো রাজার রাজত্বের আরো এক গৌরবময় সমাপ্তি ঘটতে পারে।
মেসির জাদু এখনো অমলিন
বয়স ৩৯ ছুঁয়েছে; কিন্তু মাঠে নামলেই যেন সময়কে থামিয়ে দেন লিওনেল মেসি। গোল, অ্যাসিস্ট, আক্রমণভাগে নেতৃত্ব এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা- সব মিলে এখন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবলার রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী ইন্টার মিয়ামির অধিনায়ক। সম্প্রতি ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে প্রমাণ করেছেন, বয়স তার প্রতিভা ও ক্ষুধাকে এতটুকুও কমাতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল মঞ্চে আর্জেন্টিনাকে উঠিয়ে নিয়ে আসার পেছনে অন্যতম প্রধান কারিগর মেসি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ ব্যবধানে নাটকীয় জয়ে দুই গোলেই অ্যাসিস্ট করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা, নিখুঁত পাস এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতায় দলের এগিয়ে চলার অন্যতম চাবিকাঠি।
জাতীয় দল ও ক্লাব মিলে টানা ১৩ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্টে অবদান রেখে দুর্দান্ত ফর্মের সাক্ষী হয়েছেন মেসি। যা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। বিশ্বকাপে মেসির প্রভাব শুধু গোল বা অ্যাসিস্টে সীমাবদ্ধ নয়, পুরো ম্যাচজুড়ে বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ সাজানো, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস জোগানোর ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অনন্য। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির দলে তিনি এখন শুধু অধিনায়ক নন, বরং কৌশলগত দিকনির্দেশকও।
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পলের ভাষায়, মাঠে হাসিখুশি ও আত্মবিশ্বাসী মেসিকে দেখলে পুরো দলই অনুপ্রাণিত হয়। সতীর্থদের বিশ্বাস, তার উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয় এবং কঠিন ম্যাচেও জয়ের বিশ্বাস তৈরি করে।
ক্লাব ফুটবলেও ইন্টার মিয়ামির হয়ে নিজের ছাপ রেখে চলেছেন মেসি। চলতি মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তিনি দলের আক্রমণভাগের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙতে তার দূরদর্শী পাস, ফ্রি-কিক দক্ষতা এবং বল নিয়ন্ত্রণ এখনো আগের মতোই কার্যকর। মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি এখন আর শুধু গতি বা ড্রিবলিং নয়; বরং ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন খেলার ছন্দ ধীর করতে হবে কিংবা কোন মুহূর্তে সতীর্থকে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে- এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে মেসি।
স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যাচে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন মেসি। অনেকের ধারণা, এটি হতে পারে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ফলে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ের পাশাপাশি এটি হতে পারে কিংবদন্তি এই ফুটবলারের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।
ইয়ামালের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ফুটবল বিশ্ব
কিশোর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে ইতোমধ্যেই নিজের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে ফেলেছেন বার্সেলোনার তরুণ উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল। অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত গতি এবং পরিণত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাকে ইউরোপের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ক্লাব ও জাতীয় দল- উভয় পর্যায়েই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন ইয়ামাল।
বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ইয়ামাল খুব অল্পবয়সেই মূল দলে জায়গা করে নেন। অভিষেকের পর থেকেই বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। বড় মঞ্চের চাপ সামলানোর মতো মানসিক দৃঢ়তা রয়েছে তার। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে সুযোগ তৈরি করা, গোলে সহায়তা করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখা- সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে চলেছেন।
ডান প্রান্তে খেললেও ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভেতরে কেটে এসে আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা। বাঁ পায়ের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের সহজেই পরাস্ত করতে পারেন। তার দ্রুত গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং একের বিপক্ষে এক লড়াইয়ে সফল হওয়ার ক্ষমতা বার্সেলোনার আক্রমণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই নয়, সতীর্থদের সাথে সমন্বয় করেও নিয়মিত সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছেন এই তরুণ সেনসেশন।
স্পেন জাতীয় দলের জার্সিতেও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন ইয়ামাল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিষেকের পর থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবলে নজর কেড়ে চলেছেন। বড় প্রতিযোগিতায়ও পরিণত পারফরম্যান্সে অনেক অভিজ্ঞ ফুটবলারের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে চাপের মুহূর্তে শান্ত থেকে দলের আক্রমণ পরিচালনায় ভূমিকা প্রশংসনীয়।
ইয়ামালের সবচেয়ে বড় গুণ মাঠের বুদ্ধিমত্তা। খেলার মাঠে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কখন ড্রিবল করবেন, কখন পাস দেবেন কিংবা কখন নিজেই শট নেবেন- এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাকে আরো প্রশংসিত করে তুলেছে। সেই সাথে ম্যাচের গতি বুঝে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার দক্ষতাও অন্যদের থেকে আলাদা করেছে ইয়ামালকে।
ইয়ামালকে ঘিরে উচ্ছ্বাসে তুঙ্গে আছেন সমর্থকরাও। খেলার ধরনই তাকে বিশেষ করে তুলেছে এবং সেই পরিচয় ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য। অনেকে এখনই তাকে বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে দেখছেন। ইয়ামালের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ম্যাচজুড়ে তার সক্রিয় উপস্থিতি, সৃজনশীল পাস এবং আক্রমণভাগে নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করার কারণে প্রতিপক্ষের কোচদের আলাদা পরিকল্পনা করতে হচ্ছে তাকে ঠেকাতে। এমন উন্নতিতে তার ক্লাব বার্সেলোনার কোচিং স্টাফরাও সন্তুষ্ট। তারা মনে করেন, সঠিক পরিচর্যা ও ধারাবাহিক পরিশ্রম বজায় রাখতে পারলে আগামী এক দশক ইউরোপীয় ফুটবলে অন্যতম প্রভাবশালী খেলোয়াড় হতে পারেন ইয়ামাল। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ প্রতিভাদের একজন ইয়ামাল ফাইনালে কি ছন্দ ধরে রাখতে পারবেন- এটাই দেখার অপেক্ষা।