জুলাই অভ্যুত্থানের রেশ থেকে ডিসেম্বরের শোক : ক্যাম্পাসের ২০২৫
ছাত্র সংসদ নির্বাচন, পরিবর্তন, বিতর্ক ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
Printed Edition
হারুন ইসলাম
২০২৫ সাল বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি এবং উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঘটনাবহুল বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, ২০২৫ সাল ছিল সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন, সঙ্কট এবং নতুন করে পথচলার বছর। ২০২৬ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্যাম্পাসগুলো সারা বছরই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোকে সংবাদ শিরোনামে রেখেছে।
ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে ছাত্র সংসদ নির্বাচন, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, একাডেমিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব- সব মিলিয়ে ২০২৫ শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় বছর হিসেবে বিবেচিত হবে।
ছাত্ররাজনীতির নতুন মেরুকরণ
২০২৫ সালের শুরু থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। প্রায় দেড় দশক ধরে চলে আসা একদলীয় ছাত্ররাজনীতির অবসানের পর, ক্যাম্পাসে বহু মত ও পথের সহাবস্থান সৃষ্টির চেষ্টা ছিল স্পষ্ট। বিশেষত ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এবং তাদের দ্বারা গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ বা পরে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ ক্যাম্পাস রাজনীতিতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বছরের প্রথমার্ধে ছাত্রলীগহীন ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল এবং ইসলামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবার গতানুগতিক লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে মেধাভিত্তিক ও ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকেছে। ফলে ক্যাম্পাসে আদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রকট হলেও বড় সঙ্ঘাত হয়নি। বিশেষ করে প্রগতিশীল বাম ছাত্রসংগঠন এবং ইসলামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক সারা বছর বিভিন্ন সেমিনার, টক শো ও রাজপথের কর্মসূচিতে উঠে এসেছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন
সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ (জাকসু) বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকা ইসলামী ছাত্রশিবির এই বছর প্রকাশ্যে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের অভাবনীয় ফলাফল এবং তাদের প্রার্থীদের জয়লাভ ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীরা গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছে। তবে নির্বাচনের ফলাফলের পর প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৃদু উত্তেজনা দেখা দেয়, যা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আসে।
দায়িত্ব নেয়ার পর ছাত্র সংসদের তৎপরতা
নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেয়া ছাত্র সংসদগুলো ক্যাম্পাসে সক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করে। আবাসন সঙ্কট, হলে সিটবাণিজ্য, চিকিৎসা সঙ্কট, খাবারের মান, লাইব্রেরির সময়সূচি, পরিবহন সমস্যা এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়ে প্রশাসনের সাথে বৈঠকে বসে তারা।
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য খোলা ফোরাম, নিয়মিত কার্যক্রম এবং অগ্রগতির রিপোর্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেয় সংসদগুলো। এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ছাত্র সংসদের কার্যকারিতা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা নতুন করে তৈরি হয়।
বিতর্ক ও আস্থার লড়াই
তবে ছাত্র সংসদগুলোকে ঘিরে বিতর্কও সৃষ্টি হয়। বিরোধী ছাত্রসংগঠন এবং শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশ্ন তোলে, সংসদগুলো প্রশাসনের কাছে কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকবে। অন্য দিকে সংসদ সমর্থকরা বলেন, বক্তব্য নয় কাজের মাধ্যমে আস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। বছরের পুরো সময়ে এই বিতর্ক অব্যাহত থাকে, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সংসদগুলোর সক্রিয় উপস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে।
আন্দোলনে মুখর শিক্ষাঙ্গণ
২০২৫ সালে শুধু নির্বাচন নয়, নানা দাবিতে প্রায় সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই আন্দোলন হয়। সেশনজট, আবাসন ও পরিবহন সঙ্কট, ফ্যাসিবাদী শিক্ষকদের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা- সব ইস্যুতে কর্মসূচি চলে। আন্দোলনের চাপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় এবং কিছু দাবি আংশিকভাবে মেনে নেয়া হয়।
তবে অভ্যুত্থানকালীন সময়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সাময়িক বরখাস্ত ছাড়া দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
একাডেমিক স্থবিরতা বনাম আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে উন্নতি
একাডেমিক স্থবিরতার বিপরীতে ছিল বৈশ্বিক র্যাাংকিংয়ে টিকে থাকার লড়াই। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণে আগের চেয়ে মনোযোগী হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট গবেষণাপত্র প্রকাশ ও সাইটেশনে ভালো উন্নতি দেখিয়েছে।
তবে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা এখনো সীমিত। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সেশনজটের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাংকিংয়ে ওপরের দিকে ওঠেনি। বছরের শেষের দিকে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিসার্চ ইকোসিস্টেম’ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়।
শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও উত্তাল ডিসেম্বর
বছরের শেষ ভাগে ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও অন্যান্য ক্যাম্পাসে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা এবং পরে সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যু। হাদির নামাজে জানাজায় লাখো ছাত্র অংশগ্রহণ করে। আন্দোলন চলাকালীন শাহবাগ অবরোধ এবং প্রতিবেশী দেশের দিকে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের কূটনৈতিক উত্তেজনায় ফেলেছিল।
বছরের শেষে বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল
২০২৫ সালের শেষ দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ক্যাম্পাসগুলোতে গভীর শোকের ছায়া ফেলে। ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে ‘গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। মৃত্যুর শোকের মধ্য দিয়ে ছাত্রদল তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পায়।
উপসংহার
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোর জন্য একটি ভাঙা-গড়ার বছর। পুরনো জঞ্জাল সরিয়ে নতুনভাবে সবকিছু গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া বিপ্লব ২০২৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে চেষ্টা করেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন, আন্তর্জাতিক প্রভাব, আন্দোলন, শোক ও উত্তেজনা- সবই শিক্ষার্থীদের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ২০২৬ সালে শিক্ষার্থীরা এখন স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশা করছে, যেখানে ভিন্ন মত বা আদর্শের কারণে কাউকে প্রাণ দিতে হবে না।