ভেনিজুয়েলা চলবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় দেশটির তেলও বিক্রি করবে ওয়াশিংটন
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভেনিজুয়েলা কিভাবে চলবে তার নির্দেশনা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে তাদের তেলও বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। বুধবার প্রেসিডেন্ট দফতর হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভেট বলেন, ‘আমরা ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে গভীর সমন্বয় করছি। তাদের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় হবে।’
আলজাজিরা জানায়, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সরকার চালাবেন তারা। তেল বিক্রির ব্যাপারে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ইতোমধ্যে ভেনিজুয়েলার তেলের ‘মার্কেটিং’ শুরু করেছে এবং ভেনিজুয়েলার যেসব তেল বিক্রি করা হবে সেগুলোর অর্থ নেয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যাংকে।
ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রি অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে উল্লেখ করে জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, ‘এই অর্থ মার্কিন সরকার তাদের নিজস্ব বিবেচনায় আমেরিকা এবং ভেনিজুয়েলার জনগণের কল্যাণে খরচ করবে। প্রায় তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া এখনই শুরু হচ্ছে এবং এটি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে।’
তেল বিক্রির এই অর্থ কিভাবে খরচ হতে পারে সেটিও জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ভেনিজুয়েলা তাদের এই অর্থ দিয়ে কেবল আমেরিকার তৈরি পণ্য কিনতেই রাজি হয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমি মাত্র জানতে পারলাম যে, আমাদের নতুন তেল চুক্তির মাধ্যমে ভেনিজুয়েলা যে অর্থ পাবে, তা দিয়ে তারা কেবল ‘আমেরিকায় তৈরি’ পণ্যই কিনবে। এই কেনাকাটার তালিকায় থাকবে আমেরিকার কৃষিপণ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। এছাড়া ভেনিজুয়েলার বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও আমেরিকা থেকেই কেনা হবে।’
তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপ : রয়টার্স জানায়, আটলান্টিক মহাসাগরে বুধবার ভেনিজুয়েলার সাথে সম্পর্কিত দু’টি তেলের ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এর মধ্যে একটি রাশিয়ার পতাকা বহন করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপে আমেরিকা মহাদেশে তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী পরিকল্পনার অংশ। তিনি ভেনিজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে মিত্রে পরিণত হওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছেন।
শনিবার রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ওপেকের সদস্য রাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির দিকে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়া নিষেধাজ্ঞা কবলিত জাহাজগুলো অবরোধ জোরদার করেছে।হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর আরোপ করা কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
বুধবার সকালে আটলান্টিক মহাসাগরে এক সপ্তাহ দীর্ঘ এক ধাওয়ার অবসান ঘটে। এ সময় মার্কিন কোস্টগার্ড ও দেশটির সামরিক বাহিনীর স্পেশাল ফোর্সেস আদালতের একটি জব্দ পরোয়ানা নিয়ে মারিনেরা নামের একটি তেলের ট্যাঙ্কার আটক করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ার পতাকা লাগানোর আগে গত মাসে এই ট্যাঙ্কারটি তাদের উঠতে বাধা দিয়েছিল। রাশিয়ার একটি সাবমেরিন ও জাহাজের কাছাকাছি থাকায় এই জব্দের ঘটনা মস্কোর সাথে পশ্চিমের আরো সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করেছে। রাশিয়া ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের নিন্দা করেছে আর ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বিরোধে জড়িয়ে আছে।
জাহাজ জব্দের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে ক্রেমলিন তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। অবশ্য বুধবার রাশিয়ার সরকারি ছুটির দিন ছিল। মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘এটি একটি ভুয়া রাশিয়ার তেল ট্যাঙ্কার ছিল। নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য তারা রাশিয়ার তেল ট্যাঙ্কার সাজার চেষ্টা করেছিল।’
বুধবার সকালে মার্কিন কোস্টগার্ড ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেলবাহী আরেকটি ট্যাঙ্কার আটক করেছে। এটি পানামার পতাকাবাহী, নাম এম সোফিয়া। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরপূর্ব উপকূল থেকে ট্যাঙ্কারটিকে আটক করা হয়। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি মার্কিন বাহিনীর আটক করা চতুর্থ ট্যাঙ্কার। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র রেকর্ড অনুযায়ী, ট্যাঙ্কারটি তেলে পুরোপুরি ভরা ছিল।
মারিনেরার আগের নাম ছিল বেলা-১। জব্দের সময় ট্যাঙ্কারটি খালি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি ও এম সোফিয়া একটি ‘ছায়া বহরের’ অংশ আর এসব ট্যাঙ্কার ভেনিজুয়েলা ও ইরান থেকে আনা তেল পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার বলছেন, “শুধু আমেরিকার আইন ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহনই অনুমোদিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বৈধ ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক পথের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি খাতের জন্য অসীম অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে।”
আরেক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেছেন, “মারিনেরার ক্রুরা জাহাজ জব্দ এড়াতে বেপরোয়া প্রচেষ্টা চালিয়েছে আর কোস্টগার্ডের আদেশ মানতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই তাদের ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে।’
রাশিয়া-চীন-কিউবা-ইরানের উপদেষ্টাদের বহিষ্কারে চাপ
রয়টার্স আরো জানায়, ভেনিজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশটিতে অবস্থানরত রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার সামরিক ও গোয়েন্দা উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করার জন্য চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বুধবার এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, সোমবার কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনিজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেসের কাছে ওয়াশিংটনের দাবিগুলো কী কী তা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন।
কয়েকটি সূত্রের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভেনিজুয়েলা থেকে ওই চার দেশের গোয়েন্দা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বের করে দেয়া হোক। তবে কিছু কূটনীতিককে দেশটিতে থাকার অনুমতি দেয়া হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, ভেনিজুয়েলা আর কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের জন্য কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হতে পারবে না। ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে এমন আভাস আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এবার তা আরো স্পষ্ট হচ্ছে।
গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটন দেশটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। মাদুরো আটকের পর ডেলসি রদ্রিগেস অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভেনিজুয়েলার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের সাথে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ভেনেজুয়েলার তেলের বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি রদ্রিগেসের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও। বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের বাণিজ্য শুরু করতে হবে ভেনিজুয়েলাকে।
সেক্ষেত্রে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলায় ঢুকতে দিতে হবে। সেজন্য ভেনেজুয়েলাকে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে নিজেদের জাতীয়করণ নীতি বদলাতে হতে পারে, বা শিথিলও করতে হতে পারে।