জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে দুদক

শেখ পরিবার থেকে শীর্ষ শিল্পপতি- আমলা সবাই দুদকের জালে

সালতামামি

Printed Edition

জিলানী মিলটন

দুর্নীতি দমনে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যেন ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিদ্যমান সঙ্কট উত্তরণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এই সংস্থাটির ওপর ন্যস্ত হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, অনুসন্ধান ও তদন্তে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে তারা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে এ কমিশনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু বড় ধরনের সাফল্য পরিলক্ষিত হয়েছে।

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৩টি অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি মামলা ও চার্জশিটে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ‘ভিআইপি’ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে আটকা পড়েছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় সব মন্ত্রী, সাবেক আমলা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকরা রয়েছেন।

ইতোমধ্যে দুর্নীতিবাজদের দেশে-বিদেশের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে। অসীম ক্ষমতার দুর্গে হানা দিয়ে বিদায়ী বছরে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুদক। তবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কিংবা দুদক সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার বিতর্ক থেকে সংস্থাটি এখনো মুক্ত হতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদকের কাঠগড়ায় শেখ পরিবার : চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পাশাপাশি পিছিয়ে নেই দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত মামলার তদন্তও।

গত এক বছরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীর পূর্বাচলে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় আদালত রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, ভাগনি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ পরিবারের সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৪ কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে শেখ পরিবারের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে, সেতুর টোলের ৩০৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ঘুষ হিসেবে গুলশানের প্লট দুর্নীতির মামলা, সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ৪৪৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সিআরআইর অনুদানের ৪৩৯ কোটি টাকা লেনদেনে অনিয়ম, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে অবৈধ সম্পদের মামলা এবং রাদওয়ানের চাচা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের পরিবারের বিরুদ্ধে ৬২ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা।

অন্য দিকে গত এক বছর ধরে শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগ এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে ৮০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানও চলমান রয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ পালন এবং শেখ মুজিবের ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে অর্থ অপচয়, ক্ষতিসাধনের অভিযোগে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাসহ অন্যান্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। আলোচিত টিউলিপ সিদ্দিক : চলতি বছরে দেশের যে কয়টি মামলা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তার মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিকের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত। ব্রিটিশ এমপি এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় মামলাটি শুধু আইনি নয় বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাত্রাও লাভ করেছে।

২০২৫ সালের শুরুতে তার বিরুদ্ধে রাজধানীর রাজউকে প্লট গ্রহণ ও সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে ক্ষমতার প্রভাব ও পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে প্লট ও সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

ঢাকার গুলশানের একটি প্লট ‘অবৈধভাবে হস্তান্তরের ব্যবস্থা’ করে দেয়ার বিনিময়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে একটি ফ্ল্যাট নেয়ার অভিযোগে টিউলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্বাচলে মা শেখ রেহানা, ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও বোন আজমিনা সিদ্দিকসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ৩০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেয়ার মামলার রায়ে ইতোমধ্যে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৮৯০টি মামলা ও চার্জশিটে বিভিন্ন শ্রেণীর সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ অধিকাংশ ভিআইপিপর্যায়ের ব্যক্তিরা দুদকের জালে ফেঁসেছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ২৯৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৪১টি মামলা দায়ের করে দুদক। আর একই সময়ে এক হাজার ২০৩ জন আসামির বিরুদ্ধে ৩৪৯টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়।

এ ছাড়া একই সময়ে আরো ১ হাজার ৬৩টি নতুন অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে ৩৮২টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ। বিগত ১১ মাসে ২৩০ জন ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিয়ে ৮২টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআর) এবং ৩৯টি পরিসমাপ্তির মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

বিদায়ী বছরে দুদকের সাড়ে তিন হাজার আসামির তালিকায় রয়েছেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহেনা, ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোনের ছেলে রাদওয়া মুজিব, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা।

এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম (এস আলম), আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নাজমুল হাসান পাপন, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, জাহিদ মালিক, নসরুল হামিদ বিপু, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের আসামি করা হয়েছে।

তালিকায় রয়েছেন- এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নূরজাহার গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জেমকন গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও।

বিগত ১১ মাসে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুদক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং ঋণখেলাপিসহ প্রায় সাড়ে ৩০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৭ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

সেখানে ২০২৪ সালের পুরো সময়ে ক্রোক ও অবরুদ্ধকৃত সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে মোট ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ১১ মাসে সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার ক্ষেত্রে দুদক নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক মো: আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেয়া ছাড়া রাষ্ট্রের জন্য অন্য কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন সেই রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে গত এক বছরে তার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীবিশেষকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সে কারণেই অনুসন্ধান, মামলা ও সম্পদ অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আইনগত টেকসইতার পরীক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপকে উত্তীর্ণ করতে দুদক বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।