ফিরে দেখা জুলাই’২৪

কারফিউ, সেনা মোতায়েন আর রক্তাক্ত এক শুক্রবার

Printed Edition
জুলাই
কারফিউ, সেনা মোতায়েন আর রক্তাক্ত এক শুক্রবার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ও উত্তাল দিনগুলোর একটি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে চলা সঙ্ঘাত এদিন আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং প্রাণহানির ঘটনায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে জনজীবন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার সারা দেশে কারফিউ জারি এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা কার্যকর হয় ১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে।

এর আগে টানা পাঁচ দিন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা আরো বাড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে দেখা যায়, ১৯ জুলাই প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব থাকলেও এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এদিন নিহত হন অন্তত ৫৬ জন এবং ১৭ থেকে ১৯ জুলাই এই তিন দিনে প্রাণ হারান ১০৩ জন। অন্য দিকে নিউ এজ, সমকাল ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি উল্লেখ করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত দ্বিতীয় দিনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সকাল থেকেই রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পালিত হয়। রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, উত্তরা, ধানমন্ডি, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্টন ও প্রেস ক্লাব এলাকায় আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, নরসিংদী, গাজীপুর, খুলনা, রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ ও আহত মানুষের ঢল নামে। চিকিৎসক ও নার্সদের জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়।

দিনভর সংঘর্ষের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়, মিরপুরের কার্যালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পুরনো ভবন, রামপুরা থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও একাধিক পুলিশ বক্সে হামলা চালানো হয়। কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির অবনতির কারণে মেট্রোরেল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সাথে রাজধানীতে গণপরিবহন, দূরপাল্লার বাস ও রেল চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বাতিল করা হয়। দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় কারাগারের গেট ভেঙে শত শত বন্দী বেরিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং কারাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন বলে পরে জানানো হয়। এই ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

এ দিকে রাজধানীতে দিনভর উত্তেজনার পর রাতে গণভবনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিজিবির মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনার। সেখানেই দেশব্যাপী কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সময় ঢাকা মহানগরে সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। নিরাপত্তার স্বার্থে মোটরসাইকেল চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের তিন মন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সহসমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম। সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে আট দফা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, দুই মন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

অন্য দিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনের পেছনে বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সময়ে ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন অভিভাবকরা। ১৯ জুলাই শুধু একটি সংঘর্ষময় দিন ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। কারফিউ, সেনা মোতায়েন, দেশব্যাপী প্রাণহানি, নরসিংদী কারাগারে হামলা, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক দাবির উত্থান- সব মিলিয়ে দিনটি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি করে। জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৯ জুলাই তাই স্মরণীয় হয়ে আছে এক রক্তাক্ত, অস্থির এবং সিদ্ধান্ত নির্ধারণী দিন হিসেবে।