অনিশ্চয়তায় এনবিআর সংস্কার : ডেডলাইন পেরিয়ে গেলেও বাস্তব গতি পায়নি

Printed Edition

শাহ আলম নূর

রাজস্ব খাত সংস্কারকে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্যতম প্রধান কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজনের প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্ধারিত ডিসেম্বর ডেডলাইন পেরিয়ে গেলেও এনবিআরকে দুই ভাগে ভাগ করার সব আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ হয়নি। জানুয়ারির মধ্যে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার সরকারি ঘোষণা থাকলেও এখনো বাস্তব গতি পায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতা, বিধিবিধান চূড়ান্ত করতে দীর্ঘসূত্রতা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ের নানা আপত্তিপর্যবেক্ষণের কারণে পুরো প্রক্রিয়া প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টারা বলছেন, এনবিআর বিভাজন এখনো ঝুলে থাকা কাজ হচ্ছে রুলস অব বিজনেস (আরওবি) এবং অ্যালোকেশন অব বিজনেস (এওবি) চূড়ান্ত করা। এই দু’টি নীতিমালাই মূলত নতুন দুই দফতরের কাজের পরিধি, ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণের ভিত্তি। নিয়ম অনুযায়ী, এসব নীতিমালা প্রথমে প্রি-নিকার সভায় অনুমোদন পেতে হবে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি যাবে নিকার সভায়, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, বিভাজন প্রক্রিয়ার শেষ ধাপগুলো আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আমি নিজেও এখন কিছু চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি, যেগুলো শুরুতে এতটা স্পষ্ট ছিল না। এই প্রক্রিয়াকে সহজভাবে দ্রুত এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, তাই সতর্কতার সাথে এগোতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, গত বছরের মে মাসে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে বিদ্যমান এনবিআর কাঠামো বিলুপ্ত করে দু’টি পৃথক বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন কাঠামো অনুযায়ী একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব প্রশাসন বিভাগ। উদ্দেশ্য ছিল নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে আলাদা করে দক্ষতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে অধ্যাদেশ জারির পর থেকেই এনবিআরের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দু’টি নতুন বিভাগের দায়িত্ব, এখতিয়ার ও পরিচালন কাঠামো স্পষ্ট করতে একটি স্ট্যাচুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) জারি করাও প্রয়োজন। কিন্তু এখনো সেই এসআরও চূড়ান্ত হয়নি। পাশাপাশি নতুন দুই বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোও এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে কোন বিভাগে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করবেন, পদবিন্যাস কী হবে এবং কীভাবে জনবল বণ্টন হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বিভাগগুলোর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক সপ্তাহে এনবিআর বিভাজনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জনপ্রশাসন, বাণিজ্য, নৌপরিবহন এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ও মতামত এতে যুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হলেও তা কিছু পর্যবেক্ষণসহ ফেরত আসে। পরে সংশোধন করে আবারো রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেসের খসড়া ফের জমা দেয়া হয়েছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য প্রি-নিকার সভায় এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। সেখানে অনুমোদন মিললে নিকার সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। তবে প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন, এই প্রক্রিয়া আগামী অর্থবছরের আগেই কার্যকর করা সম্ভব হবে কি না। যদিও এনবিআর চেয়ারম্যান এসব আশঙ্কা নাকচ করে দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের মধ্যেই বিভাজন কার্যকর করতে চায় এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই প্রক্রিয়া শেষ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলছেন, এই সংস্কার বাস্তবায়নে তাদের আন্তরিকতা আছে। তবে এটি একটি দীর্ঘ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। সুষ্ঠু রূপান্তরের জন্য প্রতিটি ধাপ সতর্কভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, তাড়াহুড়ো করে বিভাজন করলে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যা রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নিকার অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে নতুন কাঠামোর অধীনে পদ সৃষ্টি, পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নানা পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে এবং সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করতেই সময় লেগেছে।

এনবিআর বিভাজনের উদ্যোগের পর থেকেই সংস্থাটির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের দফতরগুলোতে অস্থিরতা দেখা দেয়। কাজ বন্ধ, অসহযোগ আন্দোলন, কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত, চাকরি বাতিল এবং জোরপূর্বক অবসরের মতো ঘটনাও ঘটে। এতে করে রাজস্ব প্রশাসনে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা সরকারের জন্যও বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত, মূল এনবিআর সংস্কারের অধ্যাদেশটি জারি করা হয় ১২ মে ২০২৫ সালে। এরপর এনবিআরের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে সরকার একটি পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে, যার প্রধান ছিলেন জ্বালানি ও সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা ড. ফওজুল কবির খান। এই কমিটির কাজ ছিল অধ্যাদেশের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া। বিশেষ করে রাজস্বনীতি বিভাগে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ রাখা নিয়ে আপত্তি ওঠে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের নেতৃত্ব দিতে পারবেন এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তারা। তবে রাজস্বনীতি বিভাগে ম্যাক্রো অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, পরিকল্পনা এবং রাজস্বনীতি বা ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি বিভাগে আয়কর নীতি, দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি, আন্তর্জাতিক চুক্তি যাচাই, শুল্ক ও ভ্যাটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কাস্টমস-সম্পর্কিত চুক্তিতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কাজ করবেন। পাশাপাশি গবেষণা ও পরিসংখ্যান, হিসাব ও অডিট, আইসিটি এবং আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জন্যও পদ সংরক্ষিত থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নীতিগতভাবে এনবিআর বিভাজন একটি যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় সংস্কার হলেও বাস্তবায়নের গতি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সময়মতো কাঠামো চূড়ান্ত না হলে রাজস্ব খাতে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, যা অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য নেতিবাচক সঙ্কেত দেবে। তাই সংস্কারের সদিচ্ছার পাশাপাশি কার্যকর ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।