বাংলাদেশের সাথে একই সময় স্বাধীনতা পাওয়া বহু দেশ বিগত ৫০ বছরে উন্নত হয়েছে। সব ধরনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে খাবি খাচ্ছি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসততা, ক্ষমতার লোভ ও দূরদৃষ্টির অভাব দেশের পথচলা শ্লথ করেছে। এর মধ্যে বিগত ১৫ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে ফ্যাসিবাদের ধারক হাসিনা সরকার। এ সময় অগ্রসর হওয়ার বদলে দেশ পিছিয়েছে। এ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। নানাভাবে দেশের বিশৃঙ্খলা দূর করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে আয়োজন করেছে বিনিয়োগ সম্মেলন। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইউনূস সরকারের এ প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে ৫০ দেশের ৫৫০ বিনিয়োগকারী অংশ নেন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে বড় বড় উদ্যোক্তা আগ্রহের সাথে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা জেনেছেন। চার দিনের সম্মেলনের প্রথম দিনে আমন্ত্রিতরা চট্টগ্রামের আনোয়ারা কোরিয়ান ইপিজেড ও মিরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। দ্বিতীয় দিনে যান নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে। পরের দু’দিনে বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা, সেমিনার, ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় এবং সরকারের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়।

অন্তর্বর্তী সরকার এর আয়োজন করলেও বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের ওপর বর্তায়। এ সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আমন্ত্রিত বিনিয়োগকারীদের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করা। রাজনৈতিক দলগুলো নানা উপহার সামগ্রী ও প্রকাশনা তুলে দেয় বিনিয়োগকারীদের। তারা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে, পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করবে। সম্মেলনে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ সমঝোতা চুক্তি করেছে চীনা একটি প্রতিষ্ঠান। একটি স্টার্টআপ কোম্পানি ১১ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। এ সম্মেলনে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল বিনিয়োগ পাবে, এমন প্রত্যাশা ছিল না। আয়োজনের লক্ষ্য ছিল কোন ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে। এর জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা উপস্থাপন করা। সম্মেলনে আসা শত শত কোম্পানিকে এরপর অনুসরণ করা হবে। তাদের সাথে যুক্ত থেকে দীর্ঘমেয়াদে দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসার আশা করা হচ্ছে এর মাধ্যমে।

সম্মেলনে এবার সর্বাধিক চীনের ৩৪ শতাংশের বেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেন। চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ সম্মেলনের সূত্র ধরে আগামী মাসে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী সে দেশের ২০০ বিনিয়োগকারী নিয়ে বাংলাদেশ সফর করবেন। সম্মলনে উপস্থিত ১০ শতাংশ বিনিয়োগকারী ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আশা করছে, এ সম্মেলনে আসা বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীকে এরপর ফলোআপ করা হবে। তাদের মতে, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সাথে সম্মেলনের মাধ্যমে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে এটি কাজে দেবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা লালফিতার দৌরাত্ম্য। বর্তমান সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও দুর্নীতির প্রতিকূলতা দূর করতে নেয়া হচ্ছে জোরালো উদ্যোগ। আশা করা যায়, এ সম্মেলন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে উৎসাহ তৈরি করবে। বিডার মাধ্যমে একটি ধারাবাহিকতা অবলম্বন করা হবে।