চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে পতনের পর পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। সেই থেকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। দিল্লির অনুগত শেখ হাসিনার পতনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মেনে নিতে না পারায় মূলত দু’দেশের মধ্যে টানাপড়েন শুরু। অবস্থা এমন যে, ঢাকার অব্যাহত অনুরোধের পরও ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, তা ফের সামনে এলো দুই দিনের ব্যবধানে দুই দেশের হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনায়। গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচনের বিপক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার করা হয়। অন্য দিকে তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। তাকে হত্যার চেষ্টাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে আলোচনা আছে।
গণমাধ্যমে খবর, দিল্লিতে গত বুধবার আলোচনার মূল ইস্যু ছিল বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ। এ সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ভারতীয় মিশনগুলো এবং ভারতীয় ক‚টনীতিকদের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ এটি অব্যাহত রাখবে।
এখানে স্মরণযোগ্য যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে কথিত সংখ্যালঘু নিপীড়নের ধুয়া তুলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন সম্মুখে শাসকদল বিজেপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উত্তেজনা ছড়ায়।
গত ১৪ ডিসেম্বর ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাকে বলা হয়, ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের দ্রুত অবসান চায় ঢাকা। হাদিকে হত্যার চেষ্টায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা ভারতে প্রবেশ করলে তাদের গ্রেফতার করে ফেরত পাঠানোরও আহ্বান জানায় ঢাকা। ওই তলবের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে ভারতের ভ‚খণ্ড কখনো ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে একটি গুড টু ওয়ার্কিং রিলেশন চাই বলে আসছি। আমরা চাইলেই সেটি হবে, এমন তো কোনো কথা নেই! দুই পক্ষ থেকে তো সম্পর্কটিকে এগোনোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমরা দুই পক্ষ মিলে হয়তো ততটা এগোতে পারিনি। যে কারণে টানাপড়েন রয়ে গেছে।’
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের এই যে টানাপড়েন চলছে, তার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে ঢাকার ওপর দিল্লি সবসময় প্রভাব বিস্তারের মানসিকতা বজায় রেখেছে। সেই প্রভাব তীব্রতর হয় পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে। দিল্লির মানসিকতা- ঢাকা তার পরামর্শে চলুক। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর ঢাকা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলছে। সঙ্গত কারণে এ কথা বলা যায়, ঢাকাকে সমমর্যাদায় গ্রহণে দিল্লির মানসিকতা তৈরির ওপরই প্রতিবেশী দুই দেশের সুসম্পর্ক নির্ভর করছে।